প্রকৌঃ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ এর চির বিদায়ে আমরা শোকাহত

প্রকৌঃ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ

১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ সকাল। সেলফোন বেজে উঠলো। ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আগের রাতে বিছানায় গড়াতে গড়াতে রাত সাড়ে ৩টা বেজে গিয়েছিল। আমি নিশ্চিত জানি কলটি এসেছে, সাইফুল্লাহ্' কাছ থেকে। প্রতিবার স্বাধীনতা এবং বিজয় দিবসে ওঁর সঙ্গে একত্রে সাভার স্মৃতিসৌধে যেতাম। যেহেতু রাত জেগেছি তাই এতসকালে কাঁচাঘুম ছেড়ে আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। যাবো, তবে এত ভোরে নয় দুপুর/অপরাহ্নে যাবো। 

বিরক্তি নিয়ে সেলফোনের স্ক্রিনে সময় দেখলাম সকাল ০৬:৫২ মিনিট, আর নাম আমার অনুমিত সাইফুল্লাহ্ই! আমি কলটি রিজেক্ট করে আবার ঘুমুতে গেলাম।

:৫৭ মিনিটে আবার রিং বেজে উঠলো। এবার রেগে একটি বড়ো ঝাড়ি দেবো, নিয়ত করে রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো, 'চাচ্চু আমি প্রত্যয়। বাবা মারা গেছে চাচ্চু।' আমি ' মেরে গেলাম! বলে কী, রাত দেড়টার সময় যার সঙ্গে চ্যাট করলাম সে আর নেই, সকাল আনুমানিক :৩০ ' চলে গেলো ! সৃষ্টিকর্তার কী বিচিত্র লীলা! বুঝা বড়ো ভার!

ঘুম গেলো ছুটে। স্বাভাবিক হলাম ১৪/১৫ মিনিট পর। কল দেয়া শুরু করলাম ওঁর আর আমার পরিচিত ঘনিষ্টজনদের। সবাই আমার মতোই হতবাক।

সাইফুল্লাহ্ ছিলো শতভাগ আইইবি এবং ইআরসি অন্তঃপ্রাণ। যদি ঢাকা' থাকে তবে ঝড় বৃষ্টি হরতাল অবরোধ যাই হোক রমনা' আইইবি-ইআরসি চত্বরে প্রতিদিন আসবেই। আইইবি এবং ইআরসি' সকল সাংগঠনিক সামাজিক-পারিবারিক কর্মকাণ্ডে সাইফুল্লাহ্ রাখতো অহর্নিশি সক্রিয় অবদান। রাত ১১/সাড়ে ১১টায় বাড়ির দিকে রওয়ানা হবার আগপর্যন্ত সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় গপ্পোসপ্পো করবেই। আমার সঙ্গে পরিচয় প্রায় দুই যুগের। অথচ সাইফুল্লাহ্ পড়েছে বুয়েটে, আমি রুয়েটে। বাড়ি সাতক্ষীরা, আমার উত্তরবঙ্গে। বয়সেও আমার জেষ্ঠ্য। পুরো বোহেমিয়ান আর আমি আধা বোহেমিয়ান। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের রসায়নটি ভালোই জমেছিলো। মুখোবইতে আমার পোস্টে স্পষ্টভাবে উলটোপালটা মন্তব্য করতো, আমিও ছেড়ে দিতাম না। বর্তমান সমাজের নানা অবক্ষয় নিয়ে তর্ক জুড়তাম। মনমানসিকতায় ছিলো গরিববান্ধব প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার অধিকারী। মানুষের অধিকার আদায়ের যেকোনো সংগ্রামে সবসময় সমর্থন দিতো। কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবীতে শাহবাগ গণজাগরন মঞ্চের সমাবেশে দিনের পর দিন রাত সরব অংশগ্রহন ছিলো সাইফুল্লাহ্'র। ওঁর জন্ম হয়েছিলো এক পুরোপরি ধার্মিক পরিবারে কিন্ত চেতনায় ছিলো শতভাগ অসাম্প্রদায়িক। ছুটে যেতো লালন আখড়ায়, সুন্দরবনের রাসপূর্ণিমায়। একা একা চলে যেতো বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো দুর্গম অঞ্চলে, কয়েকদিন থেকে আসতো কোনো অচেনা আদিবাসীর কুঠিরে। আবার কখনও চলে যেতো বৃহত্তর ময়মনসিংহের কোনো গারো বা সিলেটের খাসি পল্লীতে। সবাইকে আপন করে নেবার মতো অসাধারণ একটা মন ছিলো সাইফুল্লাহ্'র। আইইবি, ইআরসি' দাড়োয়ান পিয়ন বেয়ারা বলপিকার সবার নিয়মিত খোঁজখবর নেয়া ছিলো ওঁর আরেকটি কাজ। প্রতি শীতের শুরুতে ওদের জন্য নতুন শীতবস্ত্র কেমন করে সংগ্রহ করবে এটা ভেবে অস্থির থাকতো। নিজের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা কোনোকালেই ছিলো না। তারপরেও অন্যান্য প্রকৌশলী বন্ধুবান্ধবদের অনুরোধ আরজি জানিয়ে ঠিকই ম্যানেজ করে ফেলতো। বিলি করতো রাত ১২টায় একা একা। অন্যকেউ জানতো না, শুধু যারা পেত তারাই জানতো। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান নানাবিধ অসঙ্গতির কারনে অভিমান করে ইস্তফা দিয়েছিলো। বিজয় দিবসের আনন্দময় ভোরে একজন মুক্তিযোদ্ধা নিলো চিরবিদায়। সাইফুল্লাহ্ ১৯৭১ সালে নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় কিন্তু কোনো সনদপত্র নেয়নি। এনিয়ে ওঁর কোনো দুঃখবোধও দেখিনি।

ওঁর সম্পর্কে লেখার আছে অনেককিছু। ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকে বিষণ্ণতায় ছেয়ে আছি আমি। মুখোবইতে কোন পোস্ট, কমেন্ট, রিঅ্যাক্টও করিনি। ৪৪ ঘন্টা পরে মুখোবইতে আবার ফিরে এলাম। তুই এখন শুয়ে আছিস মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবি গোরস্থানে। ওপারে ভালো থাকিস ভাই। আমি নিশ্চিত, ওপারে কোনো ভণ্ড হিপোক্রেটের সঙ্গে তোর দেখা হবে না যাদের তুই ভীষণ অপচ্ছন্দ করতি।

পরম করুনাময় মহান আল্লাহ্পাক তোর কবরকে জান্নাতুল ফেরদাউসের বাগান করে দিন, আমীন








Powered by Blogger.