মাছের প্রাকৃতিক প্রজণন কেন্দ্র হালদা রক্ষার্থে সমন্বিতভাবে কাজ করার উপর গুরুত্বারোপ

আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্র আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন কেন্দ্রের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ.কে.এম ফজলুল্লাহ

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৎস বিভাগ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে বিশ্বের অন্যতম মাছের প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত হালদা নদী পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি), চট্টগ্রাম কেন্দ্রের উদ্যোগে শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:০০টায় কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে হালদা-কর্নফুলী নদীর সম্ভাবনাসমূহ পুনরুদ্ধার শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। 

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আইইবি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহএবং সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)’র সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী আয়েশা আক্তার। সেমিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ মনজুরুল কিবরিয়া। আইইবি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল আলম এর সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রের সম্মানী সম্পাদক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক এর সঞ্চালনায় সেমিনারে অন্যান্যদের মাঝে কেন্দ্রের ভাইস-চেয়ারম্যান (একা. এন্ড এইচআরডি) প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন ও ভাইস-চেয়ারম্যান (এডমিন. প্রফেশ. এন্ড এসডব্লিউ) প্রকৌশলী প্রবীর কুমার দে ও প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।সেমিনারে প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন, সম্প্রতি সরকার বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতি মৎস প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীর সুরক্ষা এবং কর্নফুলীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার লক্ষে যে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে তা মেনে চলে কর্মকান্ড পরিচালিত করা গেলে কর্নফুলীর জোয়ারের পানির প্রবাহ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে হালদা নদীর সম্ভাবনাসমূহ পুনরুদ্ধার সহজতর হবে বলে অভিমত দেন। তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত জনসাধারণের সুপেয় পানির চাহিদা মেটানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতি মৎস প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত হালদা নদীকে বাঁচানোও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। এই নদীর কার্প জাতীয় মাছের রেনু সারাদেশের চাহিদার আশি শতাংশ পূরণ করে। তিনি চট্টগ্রাম ওয়াসা পানির চাহিদা মেটাতে হালদা ও কর্নফুলী নদীতে মিঠা পানি সরবরাহের জন্য বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করলেও যাতে হালদা নদীর মৌলিকত্ব নষ্ট না হয়ে সেদিকে যথেষ্ট যতœবান এবং সচেতন বলে উল্লেখ করেন। তিনি হালদা নদীর সুরক্ষা এবং বিভিন্ন মৌসুমে কর্নফুলীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের পরামর্শে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য আহŸান জানান। সেমিনারে মূল প্রবন্ধকার পাওয়ার প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি তাঁর প্রবন্ধে হালদা নদীতে মা মাছেরা ডিম ছাড়ার মৌসুমে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির দিক থেকে কি কি করণীয় হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কি ধরনের কাজ গুরত্বপূর্ণ তা বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রজনন মৌসুমে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায়। ফলতঃ এই মৌসুমে মা মাছেরা হালদা নদীতে ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় মা মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যায়। প্রবন্ধকার কর্নফুলী ও হালদা নদীর দুপাড়ে অপরিকল্পিতভাবে বসতঘর গড়ে উঠা এবং অবৈধ দখলদারিদের বিভিন্ন অপকর্ম ও যত্রতত্র বালি উত্তোলনের কারণে কর্নফুলী ও হালদা নদীর ক্রমে নাব্যতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে উঠে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। সেমিনারে প্যানেল আলোচক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হালদা বিশেষজ্ঞ ড. মোঃ মনজুরুল কিবরিয়া বিষয়ের উপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, রুইসহ কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতি প্রজনন ক্ষেত্র সারা বাংলাদেশের মধ্যে হালদা একটি। এই নদীতে ছাড়া ডিমের রেনু সারাদেশের আশি শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। তবে, তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে হালদা ও কর্নফুলী নদীর দুপাড়ে গড়ে উঠা বসতঘর, অবৈধ দখল, বালি উত্তোলন, প্রভৃতি কারণে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটে। শুস্ক মৌসুমে হালদা ও কর্নফুলী নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, জোয়ারের সময় লবনাক্ত পানি হালদা নদীতে প্রবেশ করায় মা মাছেরা হালদা নদীতে ডিম ছাড়তে পারে না। সম্প্রতি হালদা নদীর সম্ভাবনাসমূহ পুনরুদ্ধার এবং দেশে মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীকে রক্ষার জন্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহন করায় ধীরে ধীরে হালদা নদী তার পুরানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে যাচ্ছে। সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের কারনে এবছর মা মাছ হালদা নদীতে প্রায় দুই হাজার একশত কেজি মাছের ডিম ছেড়েছে। ড. মনজুরুল কিবরিয়া আরো বলেন, হালদাকে রক্ষা করতে হলে দুই পাড়ের তামাক চাষ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, বন্ধ করতে হবে দুপাড়ের গড়ে উঠা বসতি, বালি উত্তোলন। অন্যথায় এই হালদা নদী তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট হারাবে এবং মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যাবে। ড. মনজুরুল কিবরিয়া জাতীয় নদীর সকল বৈশিষ্ট হালদা নদীতে বিদ্যমান রয়েছে বিধায় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীকে জাতীয় নদী হিসেবে ঘোষনা দেয়া যায় বলেও উল্লেখ করেন। 

সেমিনারের প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহন করে কেন্দ্রের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুন, প্রাক্তন ভাইস-চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এ.এস.এম. নাসির উদ্দিন চৌধুরী, পিইঞ্জ, প্রকৌশলী এম.এ. রশীদ, প্রাক্তন সম্মানী সম্পাদক প্রকৌশলী মো: আবুল কাসেম, চট্টগ্রাম ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আরিফুল ইসলাম প্রমুখ। 


No comments

Powered by Blogger.