নাটোরের উত্তরা গণভবনের সংগ্রহশালা : সমৃদ্ধ অতীতের প্রতিধ্বনি


রাজার আমলের শতাধিক দুস্প্রাপ্য সামগ্রীর সমাহারে সাজানো হয়েছে নাটোরের উত্তরা গণভবনের সংগ্রহশালা। অতীতের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন তৈরি করেছে এ সংগ্রহশালা। দর্শণার্থীরা পরিদর্শনে এসে ফিরে যাচ্ছেন সুদূর অতীতের রাজার আমলে, শুনতে পাচ্ছেন ঐ সময়ের প্রতিধ্বনি।

সংগ্রহশালার করিডরে রাজা প্রমদানাথ রায় ও সস্ত্রীক রাজা দয়ারাম রায়ের ছবি আর রাজবাড়ীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ। মার্বেল পাথরের রাজকীয় বাথটাবে অবগাহন করতে করতে চলে যাবেন ডান পাশের কক্ষে। এ কক্ষে রাজার পালংক, ঘূর্ণায়মান চেয়ার, টেবিল, আরাম চেয়ার আর ড্রেসিং টেবিল স্থাপন করে যেন তৈরি করা হয়েছে রাজার শয়নকক্ষ ! 

বাম পাশের দ্বিতীয় কক্ষে শোভা বাড়াচ্ছে রাজ সিংহাসন, রাজার মুকুট আর রাজার গাউন। আরো আছে মার্বেল পাথরের থালা, বাটি, কাঁচের জার, পিতলের গোলাপজলদানী, চিনামাটির ডিনার সেট। এ কক্ষে লেখক গবেষকরা অনায়াসে লেখার উপাদান পেয়ে যাবেন রাজ পরিবারের লাইব্রেরির বই আর শেষ রাজা প্রতিভা নাথ রায়ের ইন্সুরেন্স বিষয়ক কাগজপত্রের মধ্যে।

একটি কক্ষ তো বলতে গেলে রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা চৌধুরাণীর। সুলেখক ইন্দ্রপ্রভাকে রাখা হয়েছে তাঁরই পিতলের ছবির ফ্রেমে। আছে তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরী, আতœজীবনী, পান্ডুলিপি, তাঁর কাছে লেখা স্বামী মহেন্দ্র নাথ চৌধুরীর রাশি রাশি চিঠি। আর এসব কিছু উদ্ধার হয়েছে যে পিতলের সুটকেস থেকে আছে সেই সুটকেস। দর্শনার্থীদের জন্যে ইন্দুপ্রভার লেখা বঙ্গোপসাগর কবিতাটি ফ্রেমে বাধাঁই করে দেয়ালে টানানো হয়েছে। ৬৭ লাইনের এ কবিতায় মুগ্ধ কবি বর্ণনা করেছেন বঙ্গোপসাগরের অপরুপ সৌন্দর্য।

করিডোর ছাড়াও সংগ্রহশালার দশটি কক্ষের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে দৃষ্টি নন্দন সব আসবাবপত্র। বিশেষ করে রকমারী সব টেবিল। এরমধ্যে ডিম্বাকৃতির টেবিল, গোলাকার টেবিল, দোতলা টেবিল, প্রসাধনী টেবিল, অস্টভূজ টেবিল, চর্তুভূজ টেবিল, কর্ণার টেবিল, গার্ডেন ফ্যান কাম টি টেবিল ইত্যাদি।

প্রায় তিনশ’ বছর আগে ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে দয়ারাম রায় উত্তরা গণভবন খ্যাত দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীর গোড়াপত্তন করেন। ১৮৯৭ সালের প্রলয়ংকারী ভূমিকম্পে রাজবাড়িটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়ার পর থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছর ধরে বিদেশী বিশেষজ্ঞ, প্রকোশলী, চিত্রশিল্পী এবং কারিগরদের সহায়তায় আজকের এ নয়নাভিরাম রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হওয়ায় প্রাসাদটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে ১৯৬৬ সালে ইস্ট পাকিস্তান হাউজ, ১৯৬৭ সালে গভর্ণর হাউজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে রাত্রি যাপন করেন এবং এটিকে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় বাসভবন হিসেবে উত্তরা গণভবন নামকরণ করেন। 

অপরুপ সাজে সজ্জিত রাজপ্রাসাদ ছাড়াও চারপাশ বেষ্টন করে থাকা ১০ ফুট উঁচু সীমানা প্রাচীর আর ১৪ একরের লেক, সিংহদুয়ারের উপরে বিশাল ঘড়ির ঘন্টা, ইটালিয়ান গার্ডেনে শ্বেতপাথরের অপরুপ চারটি নারী ভাস্কর্য, মার্বেল পাথরের আসনসহ সভা মঞ্চ, হৈমন্তি, পারিজাত,ম্যাগনোলিয়াসহ অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষরাজি নিয়ে নাটোর শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে ৪১.৫ একর জমির উপরে নীরব অহংকারে দাঁড়িয়ে আছে উত্তরা গণভবন। 

এ রাজ পরিবারের অনন্য অবদানের মধ্যে রাজশাহীর বরেন্দ্র যাদুঘর ও পি এন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং নাটোরের সদর হাসপাতাল ও পি এন উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অন্যতম।

২০১২ সাল থেকে দর্শনার্থীরা ১০ থেকে ২০ টাকা দর্শনীর বিনিময়ে রাজপ্রাসাদ আর ইটালিয়ান গার্ডেন ছাড়া উত্তরা গণভবন দেখতে পারছেন। গত ৯ মার্চ রাজবাড়ীর ট্রেজারি ভবনে জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুনের উদ্যোগে সংগ্রহশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। উদ্বোধনের পর ১১ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৩০ টাকা দর্শনীর বিনিময়ে চার হাজার ২২২জন দর্শনার্থী সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেছেন।

সংগ্রহশালা পরিদর্শন করে কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ শহীদুর রহমান বলেন, লেখক-গবেষকদের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এ সংগ্রহশালা। সংগ্রহশালার মাধ্যমে ইতিহাস জানা যাবে বলে জানান শিক্ষার্থী টুম্পা দেবনাথ। খুলনা বি এল কলেজের অধ্যাপক খুশী জাহান সংগ্রহশালায় প্রবেশ মূল্য কমানোর দাবি জানান। সঙ্গীত প্রশিক্ষক মাসুমা সুলতানা সংগ্রহশালাকে অতীতের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন উল্লেখ করে বলেন, এখানে আসলে সমৃদ্ধ অতীতের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

নাটোর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি পিপি এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম সংগ্রহশালার সমৃদ্ধির জন্যে জাতীয় যাদুঘরে রক্ষিত দিঘাপতিয়া রাজার মূল সিংহাসনটি সংগ্রহশালায় নিয়ে আসার জন্যে জোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি গণভবন কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানান।

সংগ্রহশালা বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসকের ট্রেজারী, রাজপ্রাসাদ আর বিভিন্ন মানুষের কাছে থাকা রাজবাড়ীর সব সামগ্রী নিয়ে এ সংগ্রহশালা। রাজপ্রাসাদের বাইরে থাকা আরো সামগ্রী সংগ্রহ ও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বাসসকে বলেন, নাটোরকে পর্যটন শহর হিসেবে গড়ে তুলতে গণভবনকে আকর্ষনীয় করে উপস্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সংগ্রহশালার সমৃদ্ধিসহ গণভবন কেন্দ্রিক মাস্টার প্লান বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে জেলা প্রশাসন। 



(বাসস)  



No comments

Powered by Blogger.