খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় সমাবর্তন উপলক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন


প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় সমাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া থেকে আগত সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ ও উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শুরু করছি। আমি মুহাম্মদ আলমগীর, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। আমার সঙ্গে উপস্থিত আছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডীন প্রফেসর ড. কাজী হামিদুল বারী, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডীন প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুর রফিক, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডীন প্রফেসর ড. মিহির রঞ্জন হালদার, পরিচালক (ছাত্রকল্যাণ) প্রফেসর ড. সোবহান মিয়া, রেজিস্ট্রার জি এম শহিদুল আলম।

আপনারা নিশ্চই অবগত আছেন, আগামী ২১শে চৈত্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ/০৪ এপ্রিল ২০১৮ইং বুধবার বিকেল ০৩-০০টায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমি আজ শোকাহত অবস্থায় আপনাদের মাঝে এই আনন্দের সংবাদ দিতে এসেছি। গত ২৫/০৩/১৮ইং তারিখ রবিবার ময়মনসিংহের ভালুকায় ভাড়াকৃত অস্থায়ী বাসায় গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আকস্মিক একটি বিস্ফোরণ জনিত দুর্ঘটনায় অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যাটাচ্্মেন্টরত অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী মোঃ তৌহিদুল ইসলাম ঐ দিনই, পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোঃ শাহীন মিয়া, মোঃ হাফিজুর রহমান ও দিপ্ত সরকার অকালে প্রাণ হারায়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছাত্র-শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাই শোকে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহতদের স্মরণে ৩১/০৩/২০১৮ইং তারিখ হতে ০২/০৪/২০১৮ইং তারিখ পর্যন্ত টানা ০৩ (তিন) দিনের শোক পালন করা হচ্ছে।আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমরা নিজ আসন থেকে দাড়িয়ে আমাদের প্রাণ প্রিয় শিক্ষার্থীদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে এক মিনিট নিরবতা পালন করব। 

আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন যে, এ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতে সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর জনাব মো.আবদুল হামিদ, সে অনুযায়ী সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও বরেণ্য শিক্ষাবিদ আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আসগর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সম্মানিত চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান।এতে তিন অনুষদের ডীন স্ব-স্ব অনুষদের গ্র্যাজুয়েটদের ডিগ্রী প্রদানের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের নিকট উপস্থাপন করবেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর ডিগ্রী প্রদান করবেন।

মাত্র দিন কয়েক আগে এই প্রিয় মাতৃভূমির ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ থেকে ‘উন্নয়নশীল দেশে’ উত্তরণের উৎসবে মেতে উঠেছিলো পুরো জাতি। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ এই বিরল আসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অপরিসীম কৃতজ্ঞতা জানাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক, সততা, দক্ষতা ও মানবিকতার জন্য সারাবিশ্বে অনুকরণীয় নেতা, আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাকে। এ অর্জনের মূলে রয়েছে আমাদের স্বাধীনতা, যা অর্জিত হয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপোষহীন, সাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃেত্বর গুণে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণ, ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম এবং অসংখ্য মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা। আমি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ই আগষ্ট নিহত সকল শহীদ ও ৩ নভেম্বর জেলখানায় নিহত চার জাতীয় নেতাসহ ৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আজ অবধি সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যাঁরা আত্মহুতি দিয়েছে তাঁদের সবাইকে।

আজ থেকে চুয়ালি¬শ বছর আগে, ১৯৭৪ সালের ৩ জুন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এঁর বিশেষ নির্দেশনায় শিক্ষা কার্যক্রম শুষ¦ হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশে ও বিদেশে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। এ পর্যন্ত অত্র প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বমোট ৬৬৮৩ জনকে ডিগ্রী সনদ প্রদান করা হয়েছে। এ সমাবর্তনে যে সকল শিক্ষার্থী ২০১০-২০১১ থেকে ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে বি.এস-সি. ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিইউআরপি এবং ২য় সমাবর্তনের পর হতে এ সময়কাল পর্যন্ত  পি-এইচ.ডি., এম. ফিল, এম.এস-সি. ইঞ্জিনিয়ারিং ও এম. এস-সি. ডিগ্রী অর্জন করেছেন তাদের ডিগ্রী প্রদান করা হবে। সর্বমোট ২৭৯৫ জনকে ¯œাতক ও ২২৮জনকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী প্রদান করা হবে। এর মধ্যে বি. এস-সি ইঞ্জিনিয়ারিং ২৬৫৭,  বিইউআরপি ১৩৮, এম. এস-সি ৬৯, এম. এস-সি ইঞ্জিনিয়ারিং ১০৩, এমফিল ৪৮ এবং ০৮ জনকে পিএইচ.ডি ডিগ্রীর সনদ প্রদান করা হবে। একই সাথে ¯œাতক পর্যায়ে ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে ‘বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক’ দেয়া হবে ৩৮ জন কৃতি গ্রাজুয়েটকে।

সারাবিশ্বে আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে চলার লক্ষ্য অর্জনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ দিন যাবৎ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মাত্র তিনটি বিভাগ, ১২০ জন ¯œাতক ছাত্র ও ১ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুষ¦ করা এই বিদ্যাপীঠে এখন ১৮টি বিভাগ, ০৩টি ইনস্টিটিউট, ৪৬৩৫ জন ¯œাতক ও ১০৭৩ ¯œাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং ৮৯৩ জন ছাত্রী রয়েছে। নির্মিত হচ্ছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম ‘আইটি ইনকিউবিশন ও ট্রেনিং সেন্টার’। উন্নত গবেষণাগার, দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো ও পরিচ্ছন্ন-সুন্দর নয়নাভিরাম ক্যাম্পাস গড়ে তুলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল উদ্ভাবনী শক্তির ক্রমঃবিকাশ ঘটিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবেদিত-প্রাণ শিক্ষকবৃন্দ নিজেদের সর্বোচ্চ মেধা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও শক্তি খাটিয়ে শিক্ষাদান করে চলেছেন। 

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটি একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ¯œাতক পর্যায়ে সকল বিষয়বস্তুর সমন্বয় ঘটেছে। এখানে যেমন রয়েছে সনাতনী বিষয়বস্তু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, আরবান প্লানিং ও আর্কিটেকচার। তেমনি রয়েছে যুগোপযোগী বিল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কন্সট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, এনার্জি সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাটেরিয়ালস্ সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, রয়েছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং। বর্তমান যুগের চাহিদা এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশের কথা বিবেচনায় এনে খুব শীঘ্রই আরও ০৪টি নতুন বিভাগ চালু করা হবে যার মধ্যে ওসেনোগ্রাফি সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এরোস্পেস সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং উল্লেখযোগ্য। আমাদের লক্ষ্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও গ্রাজুয়েটবৃন্দের বিচরণ ক্ষেত্র হবে নীলাভ সমুদ্রের তলদেশ থেকে সুনীল আকাশ পর্যন্ত। এজন্য প্রয়োজন আরো আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, বিশ্বমানের গবেষণা ও উন্নত পরিবেশ সৃষ্টি করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাঝে চমৎকার সেতুবন্ধন তৈরী করা। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প এখন পরিকল্পনা কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। 

সুপ্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
সাংবাদিকদের মেধা, সৃষ্টিশীলতা, মানবতাবোধের লেখনী থেকে উৎসারিত হয় সত্য নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম, তাই আপনারা হলেন দেশ ও জাতির বিবেক। আপনাদের পরামর্শ, দিক-নির্দেশনা সকলের সামনে সফলতার পথ খুলে দেয়। আশা করছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাফল্য ও সম্ভাবনাগুলো দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরবেন। 

পরিশেষে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতি কামনা করি। আপনাদের সকলের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে শেষ করছি।

No comments

Powered by Blogger.