প্রকৌশলীগণ উন্নয়নের কারিগর: ডুয়েট সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি


প্রকৌশলীগণ উন্নয়নের কারিগর। তাদের মেধা, মনন ও সৃজনশীল চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসে টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা। তাই প্রকৌশলীদের চিন্তা ও চেতনায় দূরদৃষ্টির সুস্পষ্ট প্রতিফলনের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর এর চ্যান্সেলর মো: আবদুল হামিদ। তিনি বলেছেন, আমাদের রয়েছে বিপুল মানবসম্পদ, উর্বর কৃষি ভূমি এবং সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ। জনবহুল এ দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত উপায়ে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম সুষ্ঠু ব্যবহার।
মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানের ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ নবীন গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে বলেন, জীবন চলার পথে তোমরা আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ সোপান অতিক্রম করলে। জীবনের আসল সংগ্রাম এখন থেকেই শুরু। আজকের এ সনদপ্রাপ্তী সেই সংগ্রামে অবর্তীর্ণ হবার স্বীকৃতিপত্র। এ সনদের সন্মান তোমাদের রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে তোমাদের অর্জনে দেশের মানুষের অনেক অবদান রয়েছে। তোমরা তোমাদের সেবা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম দিয়ে এ সনদের মান সমুজ্জল রাখবে। কর্মক্ষেত্রে তোমরা পৃথিবীর যেই প্রান্তেই থাক না কেন মাতৃভূমি এবং এদেশের জনগণের কথা কখনোই ভূলবে না। অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথানত করবে না। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তি যাতে তোমাদেরকে ব্যবহার করতে না পারে সেই ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে। নিজের উন্নয়নের সাথে সাথে সমাজ ও দেশের উন্নয়নের কথাও ভাববে। পরিশ্রম করে উপার্জন করবে এবং সৎভাবে জীবন যাপন করবে। অন্যায়, অসত্য এবং দুর্নীতির সাথে কখনো আপোষ করবে না। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেতনাকে সব সময় নিজের মধ্যে জাগ্রত রাখবে। দেশ ও জাতির সার্থকে সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দিবে। তোমরা তোমাদের লক্ষ্য পূরণে সফল হও-আমি তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জাতি গঠনের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। যেখানে মেধা বিকাশের সব পথ উন্মুক্ত থাকে। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং দেশ-বিদেশের সর্বশেষ তথ্য সমৃদ্ধ শিক্ষা, গবেষণা এবং সৃজনশীল কর্মকান্ডে যাতে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হতে পারে তার উন্মোচন করবে বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৌশল শিক্ষা যদিও হাতে-কলমে শিক্ষা তা সত্বেও এতে সৃজনশীলতার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। প্রকৌশলীদের জ্ঞানের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও উন্নত পাঠদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকা আবশ্যক। শিক্ষকদের হাত হবে স্নেহপরায়ন এবং অভিভাবকতুল্য।

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিসির্মাণে অবদান রাখবে-এটাই সকলের প্রত্যাশা।

রাষ্ট্রপতি বলেন, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের মহান স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু সব সময় রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে, কমছে দারিদ্রের হার। কৃষির উন্নতিতে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নারীর ক্ষমতায়ন, মহিলা ও শিশুর উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যের ধারা অব্যাহত রয়েছে। পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপনের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। স্বল্পোন্নত ক্যাটাগরী থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়নের তিনটি সূচকের মানদন্ডেই বাংলাদেশ উন্নীত হয়েছে। এটি জাতি হিসেবে আমাদের বড় সাফল্য। আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে বিবেচিত।

অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারবৃন্দ, সচিব, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীনবৃন্দ, শিক্ষক, কর্মকর্তা প্রমুখ।

সমাবর্তন বক্তৃতায় প্রফেসর আবদুল মান্নান বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির পিঠে চড়েই এই সময়ে শুরু হয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের, যার মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং চরম প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য স্বল্প ব্যয়ে দ্রুততম সময়ে পণ্য ও মেধা উৎপাদন ও তা বন্টন। তিনি পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে মেনে নিতে গ্র্যাজুয়েটদের উদ্বুদ্ধ করেন।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত রূপকল্প অনুযায়ী দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষার বিকল্প নেই। তিনি সুখী সমৃদ্ধশীল সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

এবারের সমাবর্তনে মোট ৩২৮৪ জনকে ডিগ্রি দেওয়া হয়েছে যার মধ্যে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে আছে ১১১ জন। এর মধ্যে পুরকৌশল বিভাগের একজনকে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে ৩৫ জন কৃতি গ্র্যাজুয়েটকে বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক দেওয়া হয়।

সমাবর্তনকে ঘিরে নবীন-প্রবীণের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল ডুয়েট প্রাঙ্গন। হ্যাট, গাউন পরিহিত গ্র্যাজুয়েটদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ডুয়েটের এনেক্স ভবন, একাডেমিক ভবন, হলসমূহ, গেটসহ চারদিক মিটিমিটি রঙিন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে ডুয়েট। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখান থেকে ডিগ্রি পেয়েছে মোট ৭৩৬২ জন শিক্ষার্থী। বর্তমানে এখানে চারটি অনুষদের অধীনে ১৩ টি বিভাগ রয়েছে। এছাড়া তিনটি ইনস্টিটিউট ও একটি রিসার্চ সেন্টার রয়েছে। প্রতিবছর এখানে ৬৫৪ জন (কোটাসহ) শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান।


No comments

Powered by Blogger.