বুয়েটের শিক্ষকতা ছেড়ে শেলটেক যাত্রা...

ড. তৌফিক এম. সেরাজ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শেলটেক (প্রা:) লিমিটেড

সফল নগর পরিকল্পনাবিদ ও একজন স্থাপত্যের জাদুকর ড. তৌফিক এম. সেরাজ । তিনি যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিক ডিজাইনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। পরিবারে মা, স্ত্রীসহ অনেকেই শিক্ষকতা পেশায় থাকলেও ওই শিক্ষকজীবন তাকে টানেনি। চেয়েছেন ভিন্ন কিছু করবেন। 

আশির দশকের কথা। দেশে তখন ব্যক্তি খাতে নতুন হাওয়া বইছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পেশাগত শিক্ষার সঙ্গে তাল রেখে আবাসন শিল্পের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান শেলটেক লিমিটেড। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তৌফিক এম. সেরাজ।

তৌফিক এম সেরাজের জন্ম ১৯৫৬ সালে ঢাকার আজিমপুর কলোনিতে। গ্রামের বাড়ি পাবনার আতাইকুলা। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। মা ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক। পড়াশুনা ঢাকার গভর্মেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল ও ঢাকা কলেজ। এরপর বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স-মাস্টার্স।

অনার্স ১৯৭৯ সালে। মাস্টার্স শেষ হয় ১৯৮২ সালে। মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর বুয়েটে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর ১৯৮৩ সালে কমনওলেথ স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে ইংল্যান্ডের লিভারপুল ইউনিভার্সিটিতে যান। পিএইচডি করেন আরবান প্ল্যানিং বিষয়ে।

“১৯৮৭ সালে দেশে এসে এক বছরের মতো বুয়েটে শিক্ষকতা করে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ এর দুই মাসের মধ্যেই শেলটেক শুরু।” শেলটেক প্রতিষ্ঠায় আমরা দু’জন ছিলাম। আমি এবং ছোটবেলার বন্ধু কুতুবউদ্দিন আহমেদ।

ক্লাস থ্রি থেকে আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করছি। সেই থেকে একই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে আজ পর্যন্ত একইসঙ্গে ব্যবসা করছি। প্রথম প্রজন্ম হিসেবে ব্যবসায় যাওয়ার ক্ষেত্রে তাই সবার মধ্যে অনীহা ছিল। এমনটা থাকাই স্বাভাবিক বলে আমার মনে হয়। কারণ মোটামুটিভাবে নিশ্চিত একটা ক্যারিয়ার ছেড়ে ব্যবসায় যাওয়া সহজ নয়।

শেলটেকের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর আমি উচ্চশিক্ষায় মনোযোগ দিই। কুতুব তখন বেসরকারি চাকরিতে ঢোকে। এর কিছুদিন পর কুতুব গার্মেন্ট ব্যবসার উদ্যোগ নেয়। সেটাও আমাদের দেশের প্রথম দিকের গার্মেন্ট ব্যবসা। আমি ’৮৭ সালে পিএইচডি শেষ করে দেশে ফেরার পর কুতুবের ব্যবসা দেখতাম।

কথাবার্তা বলতাম। কি ব্যবসা করা যায় সেগুলো নিয়ে কথাবার্তা হতো। আমি চিন্তা করতাম আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ব্যবসার। রিয়েল এস্টেট বা অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসা বিষয়ে কথা হতো দু’জনের মধ্যে। নতুন ব্যবসা হিসেবে এবং আমার পছন্দের সঙ্গে মিল থাকায় আমরা মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম যে রিয়েল এস্টেট ব্যবসাই করবো।

অর্থায়ন নিয়ে তিনি বলেন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করতে গেলে প্রথমেই পুঁজির দরকার। ততদিনে কুতুব কয়েক বছর ব্যবসা করে কিছু পুঁজি দিতে পারলো। সেই সঙ্গে নতুন ব্যবসার বিষয়টি শেয়ার করলাম পারিবারিক বন্ধু স্কয়ার গ্রুপের স্যামুলেস চৌধুরী ও তপন চৌধুরীর সঙ্গে। তারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আমাদের সঙ্গে থাকতে রাজি হলো। এভাবেই প্রাথমিক পুঁজি পাই তিন বন্ধুর কাছ থেকে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসা তখন আমাদের দেশে প্রথম।

প্রথম থেকেই আমাদের একটি পেশাদারিত্ব ছিল। যে কারণে মানুষ আস্থা রেখেছে এবং দিন দিন আস্থা বেড়েছে। নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে সেরাজ জানান, আমাদের মূল ব্যবসা আবাসন খাতে। বাংলাদেশে যে কয়টি কোম্পানি প্রথম দিকে আবাসন শিল্পে পদার্পণ করে আমরা তাদের একটি। আমরা ’৮৮-এর শেষ দিকে যাত্রা শুরু করি। নব্বইয়ের দশকে ১০-১২টার বেশি মানসম্মত কোম্পানি ছিল না। রিয়েল এস্টেট ব্যবসার প্রসারটা হয়েছে মূলত নব্বইয়ের দশকের পর থেকে।

রিয়েল এস্টেটের উন্নয়ন, নির্মাণব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর একাধিক বই রয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে আবাসন খাত নিয়ে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। নগর পরিকল্পনা ও প্রাইভেট সেক্টর হাউজিং নামে দুটি বইও লিখেছেন তিনি। বৃটেন থেকে নগর পরিকল্পনায় করা পিএইচডির থিসিসটি তৎকালীন সরকার বই আকারে প্রকাশ করেছিল। “নাগরিক সমস্যা ও নগর পরিকল্পনা”

এতে রয়েছে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সমস্যা, সমাধান ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা। নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সমস্যা, ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) নিয়ে বিশদ বর্ণনা আছে। বইটি বের করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। ‘রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট’ পাঠক সমাবেশ থেকে বের হওয়া এই বইয়ে আলোচনা করা হয়েছে,ব্যবসার দেশীয় প্রেক্ষাপটে তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক দিক দিয়ে কিভাবে একটি আবাসন প্রকল্প সফল করা যায় । বইটিতে রিয়েল এস্টেটের ধারণা, প্রশাসন, পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, আইন ও নির্মাণ নিয়ে একাধিক সারণিসহ আলোচনা করা হয়েছে।

আবাসন খাতের সূচনার দিক নিয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং সোসাইটির (রিহ্যাব) সাবেক সভাপতি ড. তৌফিক এম সেরাজ বলেন, আমরা যখন ব্যবসা শুরু করি তখন তো রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ধারণাটি তেমন প্রচারই পায়নি। ৩০ বছরের ব্যবধানে আজ রিয়েল এস্টেট একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটা অনেক বড় একটি বিষয় বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে গত দশকের শুরুতে আবাসন ব্যবসার দ্রুত উন্নতি ঘটেছে। সামনের দিনে আরো উন্নতি হবে এটা নিশ্চিত।“৩০ বছরের ব্যবধানে আজ রিয়েল এস্টেট একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। “

ব্যবসার পাশাপশি কনসাল্টিংয়ের কাজ করি। আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই কনসান্টিংয়ের সঙ্গে জড়িত। ১৯৮৮ সালের প্রথম দিক থেকেই কনসালন্টিংয়ের সঙ্গে জড়িত। কনসাল্টিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক বড় একটা উইং আছে। এ ক্ষেত্রে শেলটেক একটি ইউনিক কোম্পানি। কিন্তু আমাদের মূল ব্যবসা যেহেতু অন্যটা, তাই ঠিক টাকা কামানোই কনসাল্টিংয়ের ক্ষেত্রে আবশ্যক মনে করি না।

খুবই মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি। আর একটি সৎ মধ্যবিত্ত পরিবারে সব সময়ই টাকা-পয়সার একটা হিসাব-নিকাশ, টানাটানি থাকতই। এটাই স্বাভাবিক ছিল। আমার ব্যবসায় আমার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি বেশি প্রেরণা দিয়েছে তাহলো অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য বা স্বাধীনতার বিষয়টা আমার পছন্দের ছিল।


No comments

Powered by Blogger.