শীতকালের চার বিশেষ আমল!




শীত অধিকাংশ মানুষেরই প্রিয় ঋতু। আল্লাহর প্রিয়
বান্দাগণের কাছে এই মওসুম আরো প্রিয়। কেননা
অন্যান্য মওসুমের চেয়ে এই মওসুমে ইবাদত বেশি করা
যায় এবং সহজভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।
সেজন্য শীতকালকে রাসূল (সাঃ) নেককারদের
বসন্তকাল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সাহাবি আবু
সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘শীতকাল মুমিনের জন্য
বসন্ত ঋতু।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১১৬৫৬) অন্য বর্ণনায়
রয়েছে, ‘শীতের রাত দীর্ঘ হওয়ায় মুমিন রাত্রিকালীন
নফল নামাজ আদায় করতে পারে এবং দিন ছোট হওয়ায়
রোজা রাখতে পারে।’ (শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকি : ৩৯৪০)
এখানে কুরআন সুন্নাহর আলোকে শীতকালে খুব সহজে
আদায় করা যায় এমন চারটি আমল নিম্নরূপ :
______________
.
এক. বেশি বেশি রোজা রাখা
.
পূর্বে উদ্ধৃত হাদিস থেকে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট।
শীতকালে দিন থাকে খুবই ছোট এবং ঠাণ্ডা। ফলে দীর্ঘ
সময় না খেয়ে যেমন থাকতে হয় না, তেমনি তৃষ্ণার্ত
হওয়ারও ভয় নেই। সুতরাং কারো যদি কাজা রোজা
বাকি থাকে, তবে এটাই হলো সেগুলো আদায় করে
নেয়ার মোক্ষম সুযোগ। তাছাড়া বেশি বেশি নফল
রোজা রাখারও এটি সুবর্ণ সময়। রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে যে
ব্যক্তি একদিন রোজা রাখল, আল্লাহ প্রতিদানস্বরূপ
জাহান্নাম এবং ওই ব্যক্তির মাঝখানে ৭০ বছরের দূরত্ব
সৃষ্টি করে দিবেন।' (সহিহ বুখারি হা/২৮৪০; সহিহ মুসলিম
হা/১১৫৩)
.
শীতের এই মওসুমে বেশি বেশি যেসব রোজা রাখতে
পারেন-
. আইয়ামে বিজ তথা হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ১৫
তারিখের রোজা : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমার
প্রিয়স্পদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমাকে ৩টি কাজের ওসিয়ত করেছেন- প্রত্যেক মাসে
৩টি রোজা রাখতে, চাশতের রাকাত নামাজ পড়তে
এবং ঘুমানোর পূর্বে বিতর নামাজ আদায় করে
নিতে।’ (সহিহ বুখারি : ১১২৪) এই হাদিসের ব্যাখ্যায়
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন,
প্রণিধানযোগ্য মত হলো, এখানে ৩টি রোজা বলে
আইয়ামে বিজের রোজাই বোঝানো হয়েছে।’ (ফাতহুল
বারি)
.
. প্রতি সোম বৃহস্পতিবারের রোজা : এই দিন
রোজা রাখা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের নিয়মিত রুটিন ছিল। আয়েশা (রা.)
বর্ণনা করেন, ‘সোম বৃহস্পতিবারে রোজা রাখার
ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই
যত্নবান ছিলেন।’ (সুনানে তিরমিজি : ৭৪৫) আবু হুরায়রা
(
রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মানুষের আমলসমূহ প্রতি
সোম বৃহস্পতিবারে আল্লাহ তায়ালার নিকট পেশ করা
হয়। আর আমি চাই, আমি রোজাদার অবস্থায় আমার
আমলগুলো পেশ করা হোক।’ (সুনানে তিরমিজি : ৭৪৭)

.
. সাওমে দাউদ (.) : সামর্থ্য সক্ষমতা থাকলে
রোজা রাখার সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো সওমে দাউদ
(
.) তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন
রাখতেন না। এটাই ছিল তাঁর নফল রোজা রাখার নিয়ম।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) বলেন, নবীজি
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংবাদ প্রদান
করা হলো যে আমি বলেছি, আল্লাহর শপথ! আমি (প্রত্যহ)
দিনে রোজা রাখব এবং রাত্রে নফল নামাজে দাঁড়িয়ে
থাকব। তিনি জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, জী আমি
এমনটা বলেছি। তখন নবীজি আমাকে উপদেশ দিয়ে
বললেন, তুমি তা পারবে না। (দিনে) রোজা রাখ এবং
খাও, (রাত্রে) ঘুমাও এবং নামাজে দাঁড়াও, প্রতি মাসে
৩টি রোজা রাখ; কেননা এক নেকির বদলে দশগুণ সওয়াব
আর এটা পুরো বৎসর রোজা পালনের সমান। আমি বললাম,
নবীজি! আমি এরচেয়ে বেশি রোজা রাখতে সক্ষম।
তিনি বললেন, তাহলে একদিন রোজা রাখবে এবং দুদিন
খাবে। বললাম, আমি তারচেয়ে বেশি রাখতেও সক্ষম।
বললেন, তবে একদিন রোজা রাখবে এবং একদিন খাবে।
এটি নবী দাউদ (.) এর রোজা এবং এটি সর্বোত্তম
রোজা। বললাম, আমি তারচেয়ে অধিক রাখতেও সক্ষম।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে
দিলেন, এরচেয়ে উত্তম কোনো রোজা নেই। (সহিহ
বুখারি : ১৮৭৫)
_______
.
.
দুই. তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া
.
শীতকালে রাত অনেক লম্বা হয়। যে কেউ চাইলে
পূর্ণরূপে ঘুমিয়ে আবার শেষরাতে তাহাজ্জুদ পড়তে সক্ষম
হবেন। একদিকে ঘুমের যেমন কোনো কমতি হবে না
অন্যদিকে মহান একটি ইবাদত আদায়ের পবিত্র অভ্যাস
গড়ে উঠবে। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সম্পর্কে বলেন,
তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা
তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে আশায় এবং আমি
তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয়
করে।’ (সূরা সিজদাহ : ১৬) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘তারা
রাত্রির সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত।’ (সূরা যারিয়াত,
আয়াত : ১৭)
_______
.
.
তিন. পূর্ণরূপে ওজু করা এবং নামাজের অপেক্ষা করা
.
মানুষ শীতকালে ওজু করা কষ্টকর মনে করে। অথচ
একদিকে ঠাণ্ডার সময় পরিপূর্ণভাবে ওজু করা বিপুল
সওয়াবের কাজ। এমনকি শীতের মওসুমে গরম পানি দিয়ে
ওজু করলেও সেই পুণ্যের প্রতিদান পাবেন। অন্যদিকে
দিন ছোট হওয়ায় ফরজ নামাজগুলো খুব কাছাকাছি
সময়ে আদায় করা হয়। ফলে এক নামাজ আদায় করে
পরবর্তী নামাজের জন্য মসজিদে বসে অপেক্ষা করা খুব
কঠিন কাজ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কিছু
শিখিয়ে দেব না; যার কারণে আল্লাহ তায়ালা পাপ
মোচন করবেন এবং জান্নাতে তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি
করবেন? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ আল্লাহর রাসূল!
নবীজি বললেন, মন না চাইলেও ভালোভাবে ওজু করা,
অধিক পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক নামাজের
পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করা।’ (সহিহ মুসলিম
:
২৫১)
_______
.
.
চার. বস্ত্র দান করা
আমরা সকলেই অবগত, দুনিয়ার বহু অঞ্চলে নির্যাতিত
মুসলমানরা শরণার্থী শিবিরে কিংবা নিজদেশে
আর্থিক অসচ্ছলতা হেতু মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
ঠাণ্ডা থেকে আত্মরক্ষার জন্য তাদের নিকট পর্যাপ্ত
কাপড়ের ব্যবস্থা নেই। শীতের আমেজে আমরা উষ্ণ
পোশাক পড়ে যখন শীতকেউপভোগকরি, তখন লাখো
মানুষ একটু উষ্ণতার জন্য জবুথবু হয়ে খড়কুটো জ্বালিয়ে
জীবনটাকে টেনে নিয়ে যায়। মানবিক এবং ইসলামি-
উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে ওইসব মানুষের পাশে দাঁড়ানো
বিত্তবানদের কর্তব্য। শুধু বিত্তবান নয়, সাধারণ মানুষও
সাধ্যমতো এগিয়ে আসতে পারেন।
.
একজন মুসলমানকে কাপড় দান করার কী ফজিলত- সে
বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
যে মুমিন অপর বস্ত্রহীন মুমিনকে কাপড় পরিয়ে দিল
আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে জান্নাতের সবুজ কাপড় পরিয়ে
দেবেন।' (সুনানে তিরমিজি : ২৪৪৯, মুসনাদে আহমাদ :
১১১১৬) অন্য বর্ণনায় এসেছে : আল্লাহ তাকে জান্নাতি
পোশাক পরিয়ে দেবেন।' (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব :
/৯২)
Powered by Blogger.