কে বলেছে ভাল মানুষ নাই, অবশ্যই আছে। আর তাদের জন্যই পৃথিবীটা এত সুন্দর


১) আমি দেখলাম রাস্তার পাশে একজন "মা" প্রচণ্ড শীতে গুটিশুটি হয়ে বসে আসে। আমার মত হাজার
আমজনতা যাকে ইতিমধ্যে পাগলী উপাধি দিয়ে দিয়েছে। আমি দেখলাম, এক পুলিশ অফিসার সেই "মা" কে দেখতে পেয়ে নিজের গায়ের জ্যাকেটটি সেই মায়ের গায়ে পড়িয়ে দিচ্ছে।
পাশের অবাক জনতা শুধু চেয়ে চেয়ে ঘটনাটি বোঝার চেষ্টা করতেছে।

২) "আমি দেখলাম একটা ছোট কুকুরের বাচ্চার
মাথা থেতলে গেছে। গলা থেকে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার এক পাশের গর্তে একটা ছোট পুকুর তৈরি হল। কুকুরটা যখন পেছনের একটা পা একটু করে নাড়াল তখন আমার কষ্টটা বেড়ে গেল। আমি বুঝলাম তার মৃত্যু যন্ত্রণা এখনো শেষ হয় নি।
আমি মুখ থেকে ওহহ! জাতীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। কুকুরটার কথা যখন আমি প্রায় ভুলেই গেছি তখন দেখলাম তিনজন যুবক তাকে কোলে নিয়ে একটা গাড়ির পেছনের সীটে
বসাল। তারা একটা প্রায় মৃত বেওয়ারিশ
কুকুরকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে এই
দৃশ্যটা অনেকটা আমার শার্টের কলার ধরে
বুঝিয়ে দিয়েছে, মুখ দিয়ে ওহহ শব্দ করে
কেটে পড়া কতটা হৃদয়হীনতার নমুনা হতে পারে।

৩) "এক তুফান বৃষ্টির রাতে আমি মেডিক্যালের সামনের রাস্তায় এক বাচ্চা শিশুকে কাঁদতে দেখে দাড়িয়ে গেলাম। শিশুটির পাশে তার মা ঘুমিয়ে আছে দেখে
আমার উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল। কেন
মানুষটা এই ঝড়ের রাতে তার শিশুকে নিয়ে
অন্তত একটা সানসেডের নিচে আশ্রয় নিল না;
এইসব ভেবে ভেবে আমার কাছে তার জননীকে পৃথিবীর সব থেকে হৃদয়হীন মা মনে হল।
ঝড় যখন বেড়েই চলছিল, আশে পাশের
ফার্মেসী গুলো যখন সাটার লাগাতে শুরু করল,
বাচ্চাটি যখন কাঁদতে কাঁদতে শীতে কাঁপার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলছিল এবং তখনো তার মা'কে সাড়া শব্দহীন দেখার এক পর্যায় বুঝলাম আমি আসলে দাড়িয়ে
দাড়িয়ে পৃথিবীর ইতিহাসের সব থেকে হৃদয়
বিদারক দৃশ্যটা দেখছি।
একটা সহায়সম্বলহীন মা ঝড়ের রাতে
মেডিক্যালের ফুটপাতে আড়াই তিন বছরের বছরের বাচ্চাকে ফেলে দিয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে নিঃশব্দে মরে গেল !!! এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য পৃথিবীতে আর কী হতে পারে ??

শুরু করেছিলাম একজন মা আর পুলিশের কাহিনী দিয়ে। শেষ করব বেওয়ারিশ
মানুষের বাচ্চার কথা লিখে।

ভোরে যখন বাচ্চাটাকে নিয়ে আমার মত
কিছু আমজনতা মেডিকেল হাসপাতালে
গেল তখন ডাক্তারদের ব্যবহার আমাকে
রীতিমত আতংকিত করেছিল। তারা ফর্ম
দিল। পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে। কাগজপত্রের
ব্যাপার। বেওয়ারিশ বাচ্চার দায়িত্ব কে
নিবে? তখন সেখানে ইন্টার্নি করে এরকম
একজন ডাক্তার আমাকে বেশ কিছু সত্য বুঝিয়ে
দিল। একটা বেওয়ারিশ বাচ্চা রাস্তা
থেকে তুলে হাসপাতালে এনে দিয়ে
নিজেকে মনিষী ভাবার কিছু নেই। আপনি
বাচ্চাটার দায়িত্ব না নিলে এই বাচ্চাটির
দায়িত্ব কে নিবে ? ডাক্তার ?
ডাক্তার কতজন বাচ্চার দায়িত্ব নিবে ?
আমি এবং আমরা যখন মুখ দিয়ে ওহহ জাতীয় শব্দ
করে কেটে পড়ার পায়চারা করছিলাম ঠিক
তখন হাসপাতালের বেডের প্রায় বয়স্ক এক
মহিলা এই বাচ্চাটির সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে
আমাদের শার্টের কলার ধরে বুঝিয়ে দিল, মুখ
দিয়ে ওহহ জাতীয় দীর্ঘশ্বাস মানবতার না
কাপুরুষতার সিম্বল।
মানুষ আসলে সামাজিক জীব না। মানুষ
ব্যক্তিগত জীব। টেলিভিশনে একটা লঞ্চ ডুবে
যাবার দৃশ্য দেখে আমরা মুখ দিয়ে ওহহ
জাতীয় শব্দ করে ঠিকই অন্য চ্যানেলে নাটক
সিনেমা দেখতে চলে যাই। একশজন মানুষের
মৃত্যু সংবাদের চাইতে নিজের একশ ডিগ্রী
জ্বর মানুষকে বেশি ভাবায়।
তবু পৃথিবীটা এত আশ্চর্য রকমের সুন্দর কেন
জানেন ? এই মানুষ গুলোর বিচরণ সব
জায়গাতেই আছে। বাসে নিজের দাদার
বয়সী কাউকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তুমি
যখন সিটে বসে হেড ফোন লাগিয়ে রক
মেটাল গান শুনছেন তখন দেখবেন কেউ একজন
সীট ছেড়ে তোমার বিবেগের কলার চেপে
ধরে সামনের মোড়ে নেমে চলে গেছে।

ভোরের আযানের শব্দে আপনি যখন লেপে মুড়ি দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন,
জানালা খুললেই দেখবেন কতগুলো মানুষ
ঠিকই আছে, হাড় কাঁপা শীতে কাঁপতে
কাঁপতে মসজিদের দিকে এগোচ্ছে। ভাল
করে তাকালেই দেখবেন আমার/আপনার শার্টের কলার
কুচকে গেছে। একদম কুচকে দলা
মুচকে চেপ্টে থেতলে গেছে।

কে বলেছে ভাল মানুষ নাই,
অবশ্যই আছে। 

আর তাদের জন্যই পৃথিবীটা এত সুন্দর।




Sohel R Rana

 

No comments

Powered by Blogger.