জাবিতে পাখি মেলা অনুষ্ঠিত


পাখি পাখা ও পালক বিশিষ্ট স্রষ্টার এক অপরূপ সৃষ্টি। এই দ্বিপদী প্রাণীটি দেখতে কার না ভাল লাগে। পৃথিবীর প্রায় সব খানেই পাখির দেখা মেলে। পাখি গবেষকদের মতে পৃথিবীতে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির আছে। 

তবে এর মধ্যে কিছু প্রজাতির পাখি শিকার সহ নানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিকারের জন্য বিলুপ্তির পথে রয়েছে আরো শতাধিক প্রজাতি। তবে আশার কথা হচ্ছে সম্প্রতি পাখি সংরক্ষণে পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

তেমনি পাখির প্রতি গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ২০০১ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ‘পাখি মেলা’। তারই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার অতিথি পাখির ক্যাম্পাস খ্যাত এ বিদ্যাপীঠে ১৭তম ‘পাখিমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এ মেলায় ভোরের কুয়াশা উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা বয়সি হাজারো দর্শনার্থীর ভিড় জমে। কিন্তু জাবির লেকগুলোতে দেখা মিলছেনা তেমন কোন অতিথি পাখি। তাই হতাশা প্রকাশ করেছে মেলায় আসা দর্শনার্থীরা।
সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ফারজানা ইসলাম বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন।

এ সময় উপাচার্য বলেন, স্রষ্টা আমাদেরকে এই সৌন্দর্য মন্ডিত ক্যাম্পাস উপহার দিয়েছে। যেখানে আমরা কিছু মেলার আয়োজন করে থাকি। জাহাঙ্গীরনগরে বিচিত্র ধরণের পাখি আছে। আমরা প্রতিদিন পাখি দেখি বলে বুঝতে পারিনা। আমরা কতটা দেখেছি। কিন্তু যারা বাহির থেকে আসে তারা চমৎকৃত হয়ে যান।

তারা মনে রাখে এবং তারা বার বার আসতে চান। পাখি মেলা যারা আয়োজন করে থাকনে তারা আমাদেরকে সচেতন করে রাখেন। আমরা এখন দায়িত্বে আছি, ভবিষ্যতে যারা থাকবেন তারাও আশা করি পাখি সংরক্ষণে এই ধরণের আয়োজনকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলবেন।’

পরে পাখি ও জীববৈচিত্র রক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ আবদান রাখায় এ বছর প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার তিন’জন সাংবাদিককে ‘কনজারভেশন মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়। এ মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ডেইলী স্টারের আসাদুজ্জামান আসাদ, বাংলানিউজ২৪ডটকমের নুর আলম হিমেল, সময় টিভির তোহা খান তামিম।

এছাড়া দিনব্যাপী এ মেলার বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় পাখি দেখা প্রতিযোগিতা, পাখি বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, শিশু-কিশোরদের জন্য পাখির ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, টেলিস্কোপ ও বাইনোকুলারস দিয়ে শিশু-কিশোরদের পাখি পর্যবেক্ষণ, স্টল সাজানো প্রতিযোগিতা (পাখির আলোকচিত্র ও পত্র-পত্রিকা প্রদর্শনী), বিগ বার্ড বাংলাদেশ, বার্ড ফটোগ্রাফি এ্যাওয়ার্ড ও কনসার্ভেশন মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড ২০১৮ প্র্রদান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাখি বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন, আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় পাখিচেনা প্রতিযোগিতা (অডিও-ভিডিও এর মাধ্যমে), পাখি বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা (সকলের জন্য উন্মুক্ত) এবং পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

এ পাখি মেলা আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগি হিসেবে আছেন ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, আরণ্যক ফাউন্ডেশন, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, আইইউসিএন ও বাংলাদেশ বনবিভাগ।

পাখি মেলা সম্পর্কে পাখিমেলার আহ্বায়ক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর মো কামরুল হাসান জানান, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পাখি তথা জীববৈচিত্র সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধি। আমরা যখন শুরু করি তখন এটার এত প্রচার ছিল না। এখন এটা জাতীয় ইভেন্ট হয়ে গেছে। সারা দেশ জানে জাবিতে পাখি মেলা হয়। এতে সারা দেশে পাখি গবেষণা ও পাখি সংরক্ষণে সাড়া পাওয়া যায়। এটা পাখির প্রতি জনসচেতনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, আমরা গত ৪/৫ বছরে মেলায় নতুন গতি এনেছি। পাখি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদেরকে উৎসাহিত করার জন্য বিগ বার্ড এ্যাওয়ার্ড চালু করেছি। কোথাও নতুন পাখি পাওয়া গেলে তা আমাদের এখানে তারা সাবমিট করেন। এতে পাখি নিয়ে যারা ফটোগ্রাফি করেন তাদের উৎসাহ বাড়ে।

আমাদের ড্রয়িং কম্পিটিশনে শিশুরা পাখি নিয়ে ছবি আঁকে। এতে শিশুরা পাখির প্রতি উৎসাহি হয়। আমরা বিশ্বাস করি, নতুন প্রজন্ম যদি ছোট থেকে পাখির প্রতি ধারণা নিয়ে বেড়ে ওঠে, তবে এক সময় সে নিজেই পাখি সংরক্ষণে উদ্যোগী হবে।

আগামী বছর থেকে আমরা এ্যাওয়ার্ড ফর সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন’ নামে নতুন এ্যাওয়ার্ড চালু করতে যাচ্ছি। এতে যারা পাখি নিয়ে গবেষণা কাজ করেন তাদেরকে স্বীকৃতি ও সম্মানিত করা হবে। আমরা এখন পর্যন্ত ভালো রেসপন্স পাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, বার্ড ক্লাবই প্রথমে এই ধারণা নিয়ে আসে যে পাখি সংরক্ষণে পাখি মেলা করা যায়। এতে সচেতনতা বাড়বে। এটা একটা স্মরণীয় উদ্যোগ ছিল। প্রথমে কিছু করলে সেটা ছোট পরিসরে হয়, ক্রমে পরিধি বাড়ে। আশা করছি আগামী বছরগুলোতে পাখি মেলা আরো জাঁকজমক পূর্ণ হবে।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এ মেলায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ট্রেজারার শেখ মো. মনজুরুল হক, আরণ্যক ফাইন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, আইইউসিএন’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি রকিবুল আমিন, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক, বাংলাদেশ বন বিভাগের বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির, প্রফেসর মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ, মেলার আহ্বায়ক প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর মো. কামরুল হাসান প্রমুখ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইতিহাস বিভাগের সভাপতি প্রফেসর এটিএম আতিকুর রহমান।

No comments

Powered by Blogger.