প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পাবিপ্রবিতে


বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান চর্চার জায়গা। দেশ বিদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক  ও পন্ডিতের আগমনে একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজে সমৃদ্ধ হয় পাশাপাশি  আলোকিত করে দেশ জাতি সভ্যতা তথা এর সাথে জড়িত শিক্ষক শিক্ষার্থী সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পুর্নাঙ্গ আঙ্গিকে দাড়ানোর  জন্য জ্ঞানচর্চার সম্প্রসারণ নানাভাবে ঘটাতে হয়। কিন্তু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নানা সীমাববদ্ধতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যাকে পরিপূর্নভাবে তার দেহ পল্লবে সুসজ্জিত করতে পারে না। সময়ের পরিক্রমায় তার সকল বাধা দুর হয়ে ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের পাঠশালা হয়ে ওঠে। 

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সময়ের মাপে এখনো শিশু। কেবল দশ বছর কাটছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্নাঙ্গ অবয়বের জন্য এটা খুবই স্বপ্ল সময়। তারপরও এর সফলতার পাল্লা একেবারেই কম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে জ্ঞান অর্জনের তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের উপযুক্ত কর্মী তৈরী করছে নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কারণে পাবনা তথা উত্তরবঙ্গ শিক্ষার নগরীতে পরিণত হয়েছে।  ২০০৮ সালে পাবনা শহর থেকে তিন কিলোমিটার পূূর্বে ৩০ একর জমির উপর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এখানে রয়েছে প্রশাসন ভবন, ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান ভবন, একাডেমিক ভবন, লাইব্রেরী ভবন, ভিসি লাউঞ্জ, ক্যাফেটেরিয়া, মসজিদ, ডরমেটরি, মেইনগেইট, পাওয়ার স্টেশনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।  রয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্র হল ও শেখ হাসিনা ছাত্রী হল। স্বাধীনতা চত্বর ১৯৫২ সালের  ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির সকল আন্দোলন সংগ্রাম ও গৌরব অর্জন তুলে ধরেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিনমাফিক পাঠদানের পাশাপাশি দৃশ্যমান গবেষণা, রুটিন মাফিক কারিকলামের বাইরে  জ্ঞান চর্চা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার সাথে গবেষণা সভা সেমিনার সিস্ফোজিয়াম, এমনকি মিছিল মিটিংও অনেক সময় তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। নীরবে শতফুল ফুটলেও অনেক কিছুর দৃশ্যময়তার প্রয়োজন হয়ে ওঠে। আনন্দের সংবাদ হলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান চর্চার সুন্দর পরিবেশ রয়েছে। সবাই জ্ঞান সাগরে  সাঁতার কাটছেন। সময়ের পরিক্রমায় আমরা আরো উন্নত পঠনপাঠানের দিকে যাবো। বিশ্ববিদ্যা গ্রহণের উপযোগি পরিবেশের জন্য আমাদের তৈরী হতে হচ্ছে। আর এই পথেই সহজভাবে চলার জন্য আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আজ বুধবার ২৪ জানুয়ারি অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের দিন।  ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের কমপক্ষে দেড়শতজন প্রথিতযশা পন্ডিত , গবেষক ও শিক্ষাবিদ অংশগ্রহন করবেন। একসাথে একদিনে এই নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড়শত প্রফেসর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পদধূলি  দেবেন। তারার মেলা বসবে আজ।এইসব ষ্টার সমৃদ্ধ মানুষের আলোতে আলোকিত হবে এই বিশ্ববিদালয় পরিবার।এই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন উপলক্ষে। দশ বছরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সুযোগ আগে আসেনি। এই সুযোগ সৃষ্টি করেছেন আধুনিক ভাষা ইনষ্টিটিউট। বিশেষভাবে বলতে হয় এই ইনষ্টিটিউটের সুযোগ্য পরিচালক ও উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ারুল ইসলামের দুরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে। আজকে পাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে যে তারার মেলা বসবে তাতে আলোকিত হবে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাই। বিশেষ করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটা এক মহাউপলক্ষ নিজেকে মেলে ধরার জন্য। সম্মেলনে দেশ বিদেশের নামীদামী অনেক শিক্ষাবিদ প্রবন্ধ উপস্থাপন করছেন তেমনি অনেক নবীন শিক্ষকও সুযোগ পেয়েছেন প্রবন্ধ উপস্থাপনের।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রবহমান বাংলা চর্চার সভাপতি ও বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতনের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রফেসর ড. অর্পনা রায়। বেলুরমাঠ  রামকৃঞ্চ মিশনের অধ্যক্ষ সোয়ামী শতঞ্জনাদা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. সনৎ কুমার নস্কর, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাবিভাগের সাবেক প্রফেসর সুবোধ কুমার যশ, ডায়মন্ড হারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর তপন কুমার মন্ডল,  কুচবিহারের পঞ্চানন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর দীপান্বিতা দাশগুপ্ত, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর মোঃ সাইফুল্লার মতো নামীদামী পন্ডিতসহ প্রায় ৭০জন শিক্ষাবিদ ও গবেষক। আছেন বাংলাদেশের চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিভাগের প্রফেসর ড. মোঃ শাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ চিত্তরঞ্জন মিশ্র,পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পাবিপ্রবির উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ারুল ইসলাম। আরো উপস্থিত থাকবেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি আওয়াল কবির জয়সহ সিনিয়র শিক্ষকমন্ডলী।

এতে ভারতের ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ১৫০জন শিক্ষাবিদ ও গবেষক উপস্থিত থাকবেন।  ১০টি সেশনে প্রায় দেড়শতাধিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা কলেজের প্রায় শতাধিক প্রতিনিধিগণ সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সহযোগিতায়  এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনষ্টিটিউটের উদ্যোগে  প্রথমবারের মতো পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। 

সম্মেলন উপলক্ষে আমন্ত্রিত অতিথি ভারতের বিশ্বভারতী ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ড. অর্পনা রায় বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুরাগী গবেষক এবং শিক্ষক মন্ডলীকে ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাস চর্চার পাশাপাশি সুনিবিড় সাহিত্য  ভাবনায় নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করবে এই আয়োজন। ভারতের কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিষ্ঠ অধ্যাপক সনৎকুমার নস্কর সম্মেলন উপলক্ষে দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগকে ভাতৃবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পশ্চিম বাংলার বেলুড়মাঠ রামকৃঞ্চমিশন বিদ্যামন্দিরের অধ্যক্ষ স্বামী শাস্ত্র জ্ঞানন্দ বলেন, বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি আমাদের গর্ব, বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে রক্ষা এবং লালন করা নির্বিশেষে বাঙালির দায়িত্ব। 

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রবহমান বাংলা চর্চা কোলকাতার যৌথ উদ্যোগে এ ধরনের আয়োজনকে বাংলা ভাষা ও বাঙালি পন্ডিতদের মেল বন্ধন হিসেবে দেখছেন পাবিপ্রবির উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি মনে  করেন, খন্ডিত ও  বিকৃত ইতিহাস জাতিকে বিভ্রান্ত করে। বাঙালির ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। তাই বাঙালির সঠিক ইতিহাস চর্চায় সবাইকে এগিয়ে আসা উচতি বলে তিনি মনে করেন।

উপরের  শিক্ষাবিদদের নামের তালিকা থেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের পালে নতুন একটি পালক সংযোজিত হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে দেশের পাশাপাশি সারাবিশ্বে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। জ্ঞান অর্জনের জন্য আদর্শ বিদ্যাপিট হিসেবে এগিয়ে যাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি বাংলাদেশকেও তুলে ধরা হচ্ছে বিশ্বের দরবারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে  বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এবং জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার, গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, ফার্মেসী, পরিসংখ্যান, রসায়ন, ব্যবসায় প্রশাসন, অর্থনীতি, বাংলা, ইংরেজি, সমাজকর্ম, লোক প্রশাসন, ইতিহাস ও বাংলাদেশ স্টাডিজ, ভূগোল ও পরিবেশ, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা ও ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। রয়েছে একটি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং, বিএসসি, বি ফার্ম, বি.আর্ক, বিএসএস, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি চালু আছে। এছাড়া সান্ধ্যকালীন এমবিএ সহ রয়েছে বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্স।

 আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা এই বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিময় জ্ঞানে সমৃদ্ধ, যুগোপযোগী, দক্ষ ও মানবিকতাবোধ সম্পন্ন মানবসম্পদ সৃষ্টি করে সারা বিশ্বে অনন্য গৌরব অর্জন করবে।

স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করবে। ফলে বাংলাদেশের সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তিময় ‘পণ্য’র চাহিদা তৈরী হবে। প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সেই ডিজিটাল যুগের জন্য উপযুক্ত ও দক্ষ মানব সম্পদ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন “ভিশন ২০২১” রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ্য প্রশাসনের নেতৃত্বে দক্ষ জনবল গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে  এগিয়ে  যাচ্ছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 


No comments

Powered by Blogger.