মাছি মানেই জীবাণু: কিভাবে ছড়ায়, ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় অভিনব এক যন্ত্র


আগে যা ধারণা করা হতো, মাছি তারচেয়েও বেশি রোগ জীবাণু বহন করে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন।
দু'ধরনের মাছির ওপর গবেষণা চালিয়ে তারা বলছেন, ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের শরীরে ছ'শোরও বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এর অনেকগুলো মানবদেহে সংক্রমণের জন্যেও দায়ী। যেমন পেটের পীড়া, রক্তে দূষণ এবং নিউমোনিয়া।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, মাছি তার পা, পায়ের পাতা এবং পাখার সাহায্যে এসব ব্যাকটেরিয়া এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় খুব দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। তারা বলছেন, সত্যি কথা বলতে, মাছি তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপেই জীবন্ত ব্যাকটেরিয়াকে এক জায়গা থেকে আরেকটি জায়গায় নিয়ে যায়।

এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন এমন একজন বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডোনাল্ড ব্রায়ান্ট বলেছেন, লোকজনের কিছু ধারণা আছে যে মাছি ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের মতো প্যাথোজেন বহন করে। তবে এর মাত্রা আসলেই কতো ব্যাপক হতে পারে সেবিষয়ে তাদের কোন ধারণা নেই।

যে দু'ধরনের মাছির শরীর থেকে সংগৃহীত মাইক্রোবের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে তার একটি হাউজ ফ্লাই আর অন্যটি ব্লো ফ্লাই। 

পৃথিবীর প্রায় সবখানেই আছে হাউজ ফ্লাই। গবেষণায় এই মাছির শরীরে ৩৫১ ধরনের ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। আর ব্লো ফ্লাই, যে মাছিটি সাধারণত গরমের দেশে পাওয়া যায়, তাদের শরীরে পাওয়া গেছে আরো ৩১৬ ধরনের ব্যাকটেরিয়া। 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাছি যে জনস্বাস্থ্যের জন্যে বড় রকমের হুমকি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সেটা উপেক্ষা করে আসছিলেন। কিন্তু এতো ক্ষুদ্র হওয়া সত্ত্বেও এটি হয়ে উঠতে পারে যেকোনো মহামারীর উৎস। 

প্রফেসর ব্রায়ান্ট বলছেন, ভুলে গেলে চলবে না, যখন কোথাও মহামারীর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তখন সেখানে এই মাছি খুব দ্রুত পরিস্থিতির আরো মারাত্মক অবনতি ঘটাতে পারে।"

বিজ্ঞানীরা বলছেন, অসুখ বিসুখের ব্যাপারে এখন এই মাছিকে পূর্ব সতর্কতা হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। 


সিঙ্গাপুরে ন্যানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিফেন শুস্টার বলেছেন, "মাছিকে বায়োনিক ড্রোন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। খুব ছোট্ট একটি জায়গায়, যেখানে মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, সেখানে এই মাছিটিকে ছেড়ে দিয়ে, তারপর সেই মাছিকে আবার ধরে, পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যেতে পারে সেখানে কি কি রোগ জীবাণু বাসা বেঁধে আছে। 

এসব নিয়ে শুনুন বাংলাদেশের একজন কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর চৌধুরীর সাক্ষাৎকার। শুনতে চাইলে উপরের অডিও লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন। 

জীবাণু বহনের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি বদনাম আছে হাউজ ফ্লাই এর। এরা সবচেয়ে নোংরা। ময়লা আবর্জনার উপর বসে এবং সব ধরনের পচে যাওয়া খাদ্য, প্রাণীর মরদেহ, মল মূত্র ও বিষ্ঠা থেকে তারা নিজেদের খাবার সংগ্রহ করে। একারণে এরা মানুষ, প্রাণী ও গাছপালার জীবাণু পরিবহনের জন্যে দায়ী।

মৃত প্রাণীর শরীরে সাধারণত যে মাছিটি পাওয়া যায় তাকে বলা হয় ব্লো ফ্লাই। নগর এলাকায় এদের পাওয়া যায় বেশি। বিশেষ করে মাংস পক্রিয়াজাতকারী কারখানা বা দোকানপাটে এবং কসাইখানায় তাদের বিচরণ।

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় নতুন যন্ত্র

ম্যালেরিয়া রোগের চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে এরকম একটি ছোট্ট যন্ত্র তৈরি করেছে একটি কোম্পানি। বলা হচ্ছে, এই যন্ত্রটি দিয়ে ম্যালেরিয়ার জীবাণুর জিন বিন্যাস বা জেনোম সিকোয়েন্স করা যেতে পারে। 

এ থেকে চিকিৎসকরা খুব দ্রুতই জানতে পারবেন যে রোগী কোন ধরনের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।

ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সারা বিশ্বে প্রতি বছর পাঁচ লাখের মতো মানুষের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হয়। 

মশা এই ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে। এই জীবাণুর রয়েছে নানা রকমের প্রজাতি। কোনো কোনোটি আবার ওষুধ প্রতিরোধী।

অক্সফোর্ড ন্যানোপোর নামের একটি কোম্পানির গবেষকরা এমন একটি মোবাইল যন্ত্র তৈরি করেছেন যা দিয়ে ম্যালেরিয়ার জীবাণুটি কোন প্রজাতির সেটি জানা সম্ভব। যন্ত্রটির নাম মিনায়ন। দেখতে অনেকটা মোবাইল ফোনের মতো। 

গবেষকরা বলছেন, এর সাহায্যে ওই জীবাণুর ডিএনএর প্যাটার্ন সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। বলা হচ্ছে, এই যন্ত্রটি একটি সিকোয়েন্সার। 

টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উওকাতা সুজুকি বলেছেন, "মিনায়ন সিকোয়েন্সারের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে যে, এর মাধ্যমে গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় এলাকায় যেসব রোগ বালাই হয় অর্থাৎ সেসব ট্রপিক্যাল ডিজিজের চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে রোগী যখন খুব মারাত্মক জীবাণুতে বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয় তখন তার আর সময় নষ্ট করা চলে না। এই ডিএনএ বিশ্লেষণের কাজ আমরা শুরু করেছি ম্যালেরিয়ার জীবাণু, যক্ষ্মার জন্যে দায়ী ব্যাকটেরিয়া এবং ডেঙ্গির ভাইরাস নিয়ে। আমরা দেখেছি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এর সাহায্যে তথ্য পাওয়া সম্ভব।"
এই যন্ত্রটিকে যুক্ত করা হয় ল্যাপটপের সাথে। তারপর এই সিকোয়েন্সার থেকে তথ্য ল্যাপটপে নিয়ে ম্যালেরিয়ার জীবাণুর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। চিকিৎসকরা তখন বুঝতে পারেন যে তারা আসলে কোন প্রজাতির জীবাণুকে ধ্বংস করতে কাজ করছেন। তখন তারা বের করতে পারেন যে কোন ওষুধ ওই জীবাণুকে ধ্বংস করতে সফল হতে পারে। 

প্রফেসর সুজুকি মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে ছোট্ট এই যন্ত্রটি বড় রকমের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কারণ এর খরচ খুব কম এবং এটিকে হাতে বহন করা যায়।

তিনি বলেন, "স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সহজেই এই মিনায়ন যন্ত্রটি কিনতে পারেন। কারণ এটি খুব সস্তা। এর দাম কোনভাবেই এক হাজার ডলারের বেশি নয়।"

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই যন্ত্রটি দিয়ে নির্ভুলভাবে ডিএনএর বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এটি দিয়ে যেকোনো প্রাণীর জিন সিকোয়েন্স করা যায়। ফলে অন্যান্য রোগের চিকিৎসাতেও এই মিনায়নকে কিভাবে ব্যবহার করা যায় বিজ্ঞানীরা এখন সেটিই পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করছেন।


(BBC)

Powered by Blogger.