কৃষকের ফসল চাষে সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষনিক তথ্য সেবা দিবে ই-ভিলেজ প্রকল্পের উদ্ভাবিত সেন্সর ডিভাইস ও মোবাইল এপ্লিকেশন


রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা কনকনে শীতে মাঠে রাত-দিন খেটেও কাঙ্খিত ফলন পায় না কৃষক। সেচ, কীটনাশক কখন লাগবে, মাটি কী চায় তা সবসময় কৃষকের জন্য সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়না। প্রকৃতির কৃপা নির্ভর এই চিরাচরিত কৃষি সংকট দূর করতে গাজীপুরের ১৫ কৃষকের ক্ষেত দেখাচ্ছে আশার আলো। জেলার পাজুলিয়া গ্রামের এমদাদ পালোয়ান, মাজেদা বেগম, মামুন, সাইফুল, রুবিনাদের হাতে ছোট্ট একটি সাদা রঙের যন্ত্র। সেই যন্ত্র হাতে তারা যাচ্ছেন ফসলের ক্ষেতে। এখানে ডিভাইসটির ৪ টি সেন্সর ফসল এবং মাটি সম্পর্কে ৫ টি প্রয়োজনীয় তথ্য যোগান দিচ্ছে।


ডিভাইসটির সঙ্গে সংযুক্ত স্মার্টফোনের ‘ই-ভিলেজ’ নামের অ্যাপে কৃষক জানতে পারছে ফসলের পাতায় প্রয়োজনীয়তা পানি আছে কিনা, মাটি ও বাতাসের আদ্রতা, বাতাসের তাপমাত্রা, সূর্য রশ্মির মতো নিখুঁত বিশ্লেষণধর্মী তথ্য। ক্ষেত থেকে কৃষকের পাওয়া এসব তথ্য জমা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ই-ভিলেজ’ প্রকল্পের কেন্দ্রীয় সার্ভারে। সার্ভারে আসা তথ্য যাচাই-বিশ্লেষণ করে কৃষককে কী ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ তা জানিয়ে দেয়া হচ্ছে ওই অ্যাপের মাধ্যমে।


চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইসফস্টোন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেন্টার ফর রিসার্চ ইনফরমেশন (সিআরআই) একসঙ্গে কাজ করছে দেশের জমিতে ডিজিটাল সেবা চালুর এই প্রকল্পে। গাজীপুরের ১৫ জন কৃষকের ক্ষেতে এবছরের জানুয়ারি মাসে প্রকল্পটির পাইলট প্রজেক্ট শুরু হয়। চীনের হুয়াওয়ে প্রযুক্তি জায়ান্টের আইসফস্টোনের ডিভাইস ও অ্যাপটি কতটুকু কাজ করে তা বাস্তবে দেখতেই এই পাইলট প্রকল্প। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি থেকে কাঙ্খিত সাফল্য আশায় আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ই-ভিলেজ প্রকল্পের প্রধান ইনভেস্টিগেটর রশীদুল হাসান।


তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন,‘ডিভাইসটি আদৌ মাঠে কতটুকু কাজ করতে পারে এবং কৃষক স্মার্টফোন-অ্যাপ ব্যবহার করতে পাওে কিনা সেটা দেখাই ছিলো পাইলট প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। প্রথমে ফসলের মাঠেই ডিভাইসটি স্থাপনের কথা ভাবা হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেটাকে কৃষকের হাতে দেয়া হয়েছে। কৃষক ডিভাইস নিয়ে মাঠে গেলেও কার্যকর ভাবে প্রয়োজনীয় ডাটা সরবরাহ করবে। আগস্টের মধ্যে চূড়ান্ত ফলাফল আসার আগেই গত জুন মাসে পর্যন্ত আমাদের কাছে যেসব ডাটা এসেছে সেগুলো আশা জাগাচ্ছে।


প্রথমবারের মতো বাংলায় অডিও ভয়েসযুক্ত অ্যাপটি চালু হলো। অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইলফোনে কৃষক এখন মাটি, পানি, পাতা ও চারার সিক্ততা, তাপমাত্রা, পি এইচ লেভেল এই পাঁচটি বার্তা পেয়ে যাচ্ছে মোবাইলফোনে। এসব ডাটা বিশ্লেষণ করে “ই ভিলেজ” নামক অ্যাপসের মাধ্যমে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’


তিনি আরও বলেন,‘প্রকল্পের ১৫ জন কৃষক যাতে আমাদের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যোগাযোগ করতে পারে সেজন্য ফেসবুকের মতো একটি নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। এখানে কৃষক ফসলের ছবি পাঠাতে পারছে। আমরা প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা সহজে তাদের বোধগম্য করে সরবরাহ করতে পারছি।’


প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং সাফল্য নিশ্চিতে নিবিড়ভাবে দৃষ্টি রাখছে সিআরআই। সংস্থাটির সহকারী সমন্বয়ক (গবেষণা) তন্ময় আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন,‘ কৃষিতে ডিজিটাল বিপ্লব বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টা চলছে। মাঠ পর্যায়ে বিস্তৃত পর্যায়ে বাস্তবায়ন করার আগে এই পাইলট প্রকল্প সফলতার বার্তা দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ডিভাইস ও এটা ব্যবহারের জন্য কৃষককে দেয়া প্রশিক্ষণ কাজে আসছে। যদি মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে কৃষক সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য-পরামর্শ পাবে। এতে অতিরিক্ত কীটনাশক,সেচের বাড়তি ব্যয় প্রায় ১৫-২০ শতাংশ কম হবে এবং প্রায় ২০ শতাংশ ফলন বাড়বে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিআরআই এজন্য প্রকল্পে কৌশলগত সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছে।’


এবছরের ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর কৃষিবিদ মিলনায়তনে ই-ভিলেজ প্রকল্পের ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।চীনা দূতাবাসের আর্থিক সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। এতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে চীনের হুয়াওয়ে নির্ভর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইসফটস্টোন।


(e-village.com.bd)


No comments

Powered by Blogger.