হযরত মালেক দীনার (রঃ) এর জীবনী



হযরত মালেক দীনার (রঃ)

নাম ও পরিচয়:
হযরত মালেক দীনার (রঃ), হযরত হাসান বসরীর সঙ্গিগণের মধ্যে অন্যতম। তিনি হাসান বসরীর প্রবর্তিত তরীকার একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। পিতার দাসত্বকালে তাঁর জন্ম হয়। একদা নদী পার হবার জন্য মালেক খেয়া নৌকায় চড়লেন। নৌকা নদীর মাঝখানের কিছু অধিক পার হলে মাঝি তাঁহার নিকট খেয়ার পয়সা চাইল। মালেকের হাতে একটি কপর্দকও ছিল না। অথচ মাঝি পয়সার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। তিনি বিনয় সহকারে উত্তর করিলেন, “আমাকে মাফ কর, আমার নিকট কিছুই নাই।” ইহাতে মাঝি ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে এমন মারধর করে যে, প্রহারের ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। চেতনা ফিরে আসলে মাঝি পুনরায় তাঁহার নিকট খেয়ার পয়সা চাইল। দ্বিতীয়বারও তিনি পূর্বের মতো উত্তর দিলেন। তখন মাঝি বলতে লাগলো, “খেয়ার পয়সা না দিলে তোমাকে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিব।” সত্যি সত্যি মাঝি হাত-পা বেঁধে তাঁকে ফেলে দিতে উদ্যত হয়। হঠাৎ সে দেখতে পেল, নদীর মৎস্যসমূহ এক একটি দীনার মুখে করে দলে দলে নৌকার নিকট এসে ভেসে উঠল। হযরত মালেক হাত বাড়াইয়া একটি মাছের মুখ হতে একটি দীনার নিয়ে মাঝিকে দিলেন। নৌকার লোকজন হযরত মালেকের এইরূপ কারামত (অলৌকিক ঘটনা) দেখে বিস্মিত হয়ে তাঁর পদতলে লুটিয়ে পড়ল। তাহাদিগকে ক্ষমা করে হযরত মালেক নৌকা থেকে নেমে পানির উপর দিয়ে চলতে চলতে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। সেদিন থেকে তাঁর নামের সাথে ‘দীনার’ যুক্ত হয়।

জীবনের পরিবর্তন:
মালেক দীনার দামেস্ক নগরীর একজন ধনী অধিবাসী ছিলেন। তিনি হযরত মোয়াবিয়া নির্মিত দামেস্কের জামে মসজিদে এক বৎসরকাল এই উদ্দেশ্যে এ’তেকাফ করেছিলেন যে, যদি তিনি সেখানে এবাদতে মশগুল থাকেন, তবে সবাই তাঁকে বিশ^াস করে সেই মসজিদ সংলগ্ন সম্পত্তির মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করবেন। এই আশার বশীভ’ত হয়ে তিনি সর্বক্ষণ মসজিদে নামায ও এবাদতে মশগুল থাকতেন। অথচ মনে মনে নিজেকে মোনাফেক বা কপট বলেই জানতেন। এভাবে এক বৎসরকাল কেটে যায়। একদা রাতে তিনি মসজিদ হতে বের হলে শুনতে পান কেউ যেন বলছে, “ওহে মালেক, তুমি কেন তওবা করছো না?” মালেক ইহা শুনে বিচলিত হলেন এবং ভাবলেন, “এক বছর কপটভাবে এবাদত করেছি। ভক্তি ও এখলাসের সাথে কিছুই করলাম না।” এই অনুতাপ করতে করতে সেই রাত্রি হইতে পবিত্র ও সরল মনে আল্লাহর এবাদতে মশগুল হলেন। পরদিন সকালে মুসল্লিগণ মসজিদে এসে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, “মসজিদে খুব বিশৃঙ্খলা ঘটছে। একজন উপযুক্ত মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত করা হলে মসজিদের কার্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হবে। মালেককে ব্যাতীত অন্য কাউকে আমরা এই কাজের উপযুক্ত মনে করি না।” অতঃপর সকলে একমত হয়ে হযরত মালেকের খেদমতে উপস্থিত হল এবং মোতাওয়াল্লীর পদ গ্রহণ করতে তাঁকে অনুরোধ করলো। হযরত মালেক মনে মনে বলতে লাগলেন, “হে আল্লাহ, এক বৎসরকাল মোনাফেকের মতো তোমার এবাদত করেছি, কিন্তু কাউকে আমার প্রতি একবার পর্যন্ত দৃষ্টিপাত করতে দেখি নি। আর একটি মাত্র রাত্রি সরল মনে এবাদতে মশগুল ছিলাম বলে তুমি মোতাওয়াল্লী পদ প্রদানের জন্য কতিপয় ব্যক্তিকে আমার নিকট পাঠাইছো। আমি তোমার রহমতের কসম (শপথ) করে বলছি, এখন আমার সে আকাক্সক্ষা আর নেই।” এই বলে তৎক্ষনাৎ তিনি মসজিদ হতে বের হয়ে গেলেন এবং মোতাওয়াল্লী পদ গ্রহণে অসম্মত হয়ে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার এবাদতে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন।

হযরত মালেক দীনার (রঃ) এর জীবনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা:
১। কথিত আছে যে, এক সময় হযরত মালেক এক ভাড়াটিয়া বাসাতে ছিলেন। একজন ইহুদী তাঁর প্রতিবেশী ছিল। সেখানে সে পায়খানা নির্মাণ করেছিল এবং মল-মূত্র তাঁর ঘরের দরজায় এনে ফেলতো। এইভাবে অনেকদিন চললো। হযরত মালেক কারও কাছে এই অত্যাচারের কথা না বলে নীরবে উহা সহ্য করতে থাকেন। একদিন সেই ইহুদী মালেকের নিকট এসে বললো, “মালেক, আমার পায়খানা দ্বারা আপনার কোন কষ্ট হয় না?”
হযরত মালেক বললেন, “হ্যাঁ, হয়ে থাকে, কিন্তু একটি গামলা ও ঝাড়– রেখেছি। প্রত্যহ উহা দ্বারা ঘরের দরজা ধুয়ে পরিষ্কার করে থাকি।”
ইহুদী বললো, “আচ্ছা আপনি এতদিন ধরে কষ্ট সহ্য করছেন কেন?”
হযরত মালেক বললেন, “ইহা আল্লাহর আদেশ। কেননা তিনি ক্রোধ দমনকারীকে ভালবাসেন।”
ইহুদী বললো, “আহা, ইসলাম কি উত্তম ধর্ম। খোদাপ্রেমিকগণ এইভাবে শত্রুর অত্যাচার সহ্য করেন এবং খোদা ব্যাতীত অন্যের নিকট উহা প্রকাশ করেন না, বরং সহ্য করে থাকেন। ” এই বলে ইহুদী মুসলমান হয়ে যায়।

২। একদা হযরত মালেক একজন রোগীকে দেখতে যান। তিনি বলে, “আমি যেয়ে দেখলাম যে, তার মৃত্যু নিকটবর্তী হয়েছে। আমি তাকে কালেমা শাহাদাত বার বার বলে দিতেছিলাম। কিন্তু সে কেবলই ‘দশ-এগারো...... দশ-এগারো (১০-১১)’ বলছিল এবং কিছুতেই কালেমা উচ্চারণ করতে পারছিল না।” অবশেষে সে আমাকে বললো, “ওহে মালেক! আমার সম্মুখে এক আগুনের পাহাড় উপস্থিত। যখনই আমি কালেমা পড়তে চাই, তখনই উক্ত আগুন আমার দিকে অগ্রসর হয়।”
হযরত মালেক বলেন, “আমি এই অবস্থা দেখে তার ব্যবসায়ের বিষয়াদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম।”
লোকটি উত্তর করলো, “আমি একজন ব্যবসায়ী, মাল বিক্রয় করার সময় ক্রেতাগণকে ওজনে কম দিয়া প্রতারণা করে ব্যবসা করতাম।”

৩। বহুকাল পর্যন্ত হযরত মালেক কোন মিষ্টি বা অম্লবস্তু আহার করেন নাই। প্রত্যহ রাত্রে রুটিওয়ালার দোকানে গিয়ে রুটি ক্রয় করতেন। কোন তরকারী ব্যাতীত শুধু শুষ্ক রুটি আহার করেই রোযার ইফতার করতেন। ইহাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন। একদা তিনি পীড়িত হয়ে পড়েন এবং গোশত খাবার তার প্রবল ইচ্ছা হয়। তবুও তিনি কিছুদিন ধৈর্যধারণ করে থাকলেন। পরে যখন গোশত খাবার ইচ্ছা চরমে পৌঁছে, তখন এক কসাইয়ের দোকানে উপস্থিত হন। গোশত ক্রয়ের পর উহা কাপড়ে ঢেকে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। সকলে জানতো, হযরত মালেক গোশত খান না। এখন গোশত কিনে কি করেন তা দেখবার জন্য কসাই গোপনে তার এক চাকরকে হযরত মালেকের পেছনে পেছনে পাঠালেন। চাকরটি ফিরে গিয়ে জানায় যে, হযরত মালেক গোশত নিয়ে এক নির্জন স্থানে গমন করেন এবং কাপড়ের ভেতর থেকে গোশত বের করে তিনবার উহার গন্ধ নিয়ে নিজেকে সম্মোধন করে বলতে থাকেন, “হে আত্মা, আজ এইটুকু মাত্র তোমার কিসমতে খাওয়া হইলো, ইহার অধিক আর হইবে না।” অতঃপর গোশত ও রুটিগুলি একজন ভিক্ষুককে দান করে আত্মার সান্ত¡নার জন্য বলতে লাগলেন, “হে আমার দুর্বল মন, আমি যে তোমাকে এইরূপ কষ্ট দিতেছি তাহা তোমার শত্রুতার জন্য নয়; তুমি কিছুদিন সবর কর, এই কষ্ট শেষ হবেই এবং তখন এমন নেয়ামত তোমার নসীবে জুটিতে পারে যার কোন অন্ত নাই।”


হযরত মালেকের এন্তেকালের পর এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখলেন যে, হযরত মালেক ও হযরত ওয়াসে (রঃ) বেহেশতের দিকে যাচ্ছেন এবং হযরত মালেকই প্রথম বেহেশতে প্রবেশ করলেন। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম যে, হযরত ওয়াসে (রঃ) এত বিখ্যাত ওলী, দরবেশ ও বুযুর্গ ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁহাকে কেন হযরত মালেকের পরে বেহেশতে নেওয়া হলো। হঠাৎ গায়েবী আওয়াজ হলো, “ঠিকই বলেছো! তবে এর কারণ এই যে, হযরত ওয়াসে (রঃ) দুনিয়াতে দুইটি জামা এবং হযরত মালেক (রঃ) মাত্র একটি জামা পরিধান করতেন। ইহাই হল সম্মানের তারতম্যের একমাত্র কারণ।”

No comments

Powered by Blogger.