হযরত বিশরে হাফী (রঃ) এর জীবনী



 হযরত বিশরে হাফী (রঃ)

নাম, জন্ম ও পরিচয়:
হযরত বিশরে হাফী (রঃ) খোদাভক্ত, সত্যনিষ্ঠ, কঠোর সাধক এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বুযুর্গ ছিলেন। তাঁর জন্ম র্মাভ নগরে। পরে তিনি বাগদাদের অধিবাসী হন। তিনি হযরত আলী হাশ্রামের মুরীদ ছিলেন। তিনি পায়ে জুতা পরিধান করিতেন না, এজন্যেই তিনি ‘হাফী’ বা ‘শূন্যপদ’ খেতাব লাভ করেন। লোকে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল- “আপনি জুতা ব্যবহার করেন না কেন?” তিনি উত্তরে বলিলেন- “যে দিন আল্লাহর সহিত প্রথম ইশ্ক স্থাপন করি, সেদিন আমি শূন্যপদ ছিলাম। তাই আমি এখন জুতা পরিতে লজ্জাবোধ করি।
আল্লাহ তায়ালা বলিয়াছেন- “আমি দুনিয়ার উপরিভাগকে তোমাদের জন্য ফরশ (বিছানা) বানাইয়াছি।”
শাহী ফরশে জুতা পরিয়া যাওয়া বে-আদবী।”

কোন কোন দরবেশ মাটির ঢেলা দ্বারা শৌচ করিতেন না এবং মাটিতে থুতু ফেলিতেন না। কারণ তাঁহারা ইহাতে আল্লাহ তায়ালার নূর (জ্যোতি) দর্শন করিতেন। বিশরে হাফী (রঃ) এর অবস্থাও এইরূপ ছিল।


জীবনের পরিবর্তন:
বিশরে হাফী প্রথম জীবনে একজন মদ্যপায়ী এবং অসৎ চরিত্রের লোক ছিলেন। একদা মাতাল অবস্থায় রাস্তা দিয়ে যাবার সময় তিনি একখন্ড কাগজ দেখতে পান। তাতে- ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এই মহান কালাম লিখা ছিল। তিনি যতেœর সাথে কাগজটি উঠিয়ে ধুয়ে তাতে কিছু আতর মাখিয়ে তা’যীমের সহিত একটি উচ্চস্থানে রাখিয়া দেন। সেই রাত্রিতেই স্থানীয় এক দরবেশ স্বপ্নে দেখিলেন যে, আল্লাহর তরফ হইতে তাঁহাকে বলা হইতেছে “যাও বিশরকে যাইয়া বল, তুমি আমার নামকে যেমন তা’যীম করিয়াছ এবং ত’াযীমের সহিত উচ্চস্থানে রাখিয়াছ, আমিও তোমার মনকে তেমনি নেকের খোশবুতে পবিত্র করিয়া আমার মধ্যে তোমাকে গ্রহণ করিয়া তোমার ইজ্জত অনেক উচ্চ করিয়া দিব।”

দরবেশ এই স্বপ্ন দেখিয়া ভাবিলেন, যাহার সম্পর্কে এই স্বপ্ন দেখিলাম, সে তো ভয়ানক খারাপ লোক; তাহার পক্ষে এইরূপ হওয়া অসম্ভব। আমি হয়তো ভুল দেখিয়াছি। মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া তিনি ওজু করিয়া দুই রাক’আত নামায পড়িলেন এবং তারপর ঘুমাইয়া পড়িলেন। এবারও সেইরূপ স্বপ্ন দেখিলেন। এইরূপে তিনবার স্বপ্ন দেখিলেন।


ভোরবেলা দরবেশ বিশরের বাড়িতে যাইয়া তাঁহাকে ডাকিলেন। লোকে বলিল, সে তো অমুক সভায় শরাবখোরদের সহিত শরাব পানে মত্ত। দরবেশ নিজে সেই ঘরের দরজায় গিয়ে তাঁহাকে ডাকিতে লাগিলেন। একজন দরবেশকে জানালো যে, বিশর মদ্যপান করে বেহুঁস অবস্থায় পড়িয়া আছে। অগত্যা দরবেশ তাহাকে বলিলেন, “তুমি বিশরকে উচ্চৈঃস্বরে বলো যে, আমি তাহাকে একটি মহা খোশখবর দিতে আসিয়াছি।”
বহুক্ষণ ডাকাডাকির পর বিশর উত্তর করিলেন, “কাহার পয়গাম?”
দরবেশ বলিলেন, “আল্লাহ তায়ালার একটি পয়গাম আনিয়াছি।”
ইহা শুনিয়া বিশর কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং বলিলেন, “হায়, খোদাই জানেন, উহা কি আমার শাস্তির পয়গাম, না-কি তিরস্কারের পয়গাম।”
বিশর বাইরে আসিলে দরবেশ তাঁহকে স্বপ্নের কথা বলিলেন। বিশর তখনই বন্ধুদিগকে বিদায় দিয়া বলিলেন, “আমি চলিলাম, তোমরা কখনও আর আমাকে একাজে দেখিবে না।”
ইহার পর তিনি তওবা করিলেন এবং লোকালয় ছাড়িয়া আল্লাহর এবাদতে মশগুল হইলেন। খোদাপ্রেমে তিনি এতই মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, আর কখনও জুতা পায়ে দেন নাই।


হযরত বিশরে হাফী (রঃ) এর জীবনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা:
ক্স একবার বিশরে হাফী এক কবরস্থানের পাশ দিয়া গমনকালে দেখিলেন, কবরবাসীগণ বসিয়া কি যেন বন্টন করিতেছেন। তিনি আরয করিলেন, “আল্লাহ! ইহার তাৎপর্য কিছুই বুঝিলাম না।” তখন গায়েব হইতে আওয়াজ হইল, “সেখানে যাও এবং তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর।” তিনি তথায় যাইয়া তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলে, তাহারা বলিলেন, “এক সপ্তাহ পূর্বে এই কবরস্থানের পাশ দিয়া এক দরবেশ গমন করেন। তিনি তিনবার ‘সূরা ইখলাস’ পড়িয়া উহার সওয়াব আমাদিগকে দান করেন। তখন হইতে আমরা সেই সওয়াব বন্টনে রত। এখনও উহা হইতে আমরা অবসর পাই নাই।”

ক্স বিশরে হাফী বলেন, “আমি একদিন হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে স্বপ্নে দেখিয়া আরয করিলাম, ইয়া রাসূরুল্লাহ! আমাকে কিছু উপদেশ প্রদান করুন।” রাসূল (সঃ) বলিলেন, আল্লাহ তায়ালার দরবারে নেকীর আশায় ধনীর পক্ষে দরিদ্রগণকে দয়া করা একটি ভাল কাজ বটে, কিন্তু আল্লাহর দয়ার উপর নির্ভর করিয়া দরিদ্র লোকদের পক্ষে ধনীদিগকে অবহেলা করা তাহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাজ।”

ক্স এক দরবেশ বলিয়াছেন, “আমি তীব্র শীতের সময় একদিন বিশরে হাফীর নিকট উপস্থিত ছিলাম। দেখিলাম, তিনি শীতের মধ্যে খোলা শরীরে কাঁপিতেছেন। আমি তাহাকে প্রশ্ন করিলাম, “একি, খোলা শরীর কেন?”
তিনে বলিলেন, “দরিদ্রদিগকে স্মরণ করিতেছি; ধন নাই যাহা দ্বারা তাহাদের প্রতি সহানভূতি প্রকাশ করিতে পারি। সুতরাং শরীর দিয়াই তাহাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করিতে মনস্থ করিয়াছি।”

লোকে তাঁহাকে প্রশ্ন করিল, “আপনি কি উপায়ে এরূপ উচ্চপদে সমাসীন হইলেন?”
তিনি বলিলেন, “নিজের অবস্থা খোদা তায়ালা ব্যতীত অন্য লোকের নিকট সর্বদা গুপ্ত রাখিয়াছি। তাহাতেই এই উন্নতি।”


মৃত্যু:
কথিত আছে, বিশরে হাফীর জীবিতকালে তাঁহার প্রতি সম্মানের জন্য বাগদাদের রাস্তায় কোন চতুষ্পদ জন্তু মলত্যাগ করিত না। কারণ তিনি সর্বদা খালি পায়ে ভ্রমণ করিতেন। একদিন রাত্রে একটি জন্তু বাগদাদের রাস্তায় মলত্যাগ করিলে উহার মালিক চিৎকার করিয়া উঠে, “সম্ভবতঃ বিশরে হাফী (রঃ) জীবিত নাই; যেহেতু তাঁহারই সম্মানের খাতিরে বাগদাদের রাস্তায় কোন প্রাণী মলত্যাগ করে নাই।” পরে সে খোঁজ করিয়া জানিতে পারে যে, বাস্তবিকই বিশরে হাফী আর এই দুনিয়ায় নাই।


হযরত বিশরে হাফী (রঃ) এর বোনের ঈমান:
একজন স্ত্রীলোক ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এর নিকট উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, “হুজুর, আমি গতরাত্রে নিজের ঘরে সূতা কাটিতেছিলাম। হঠাৎ এক বৃদ্ধার মশাল নজরে পড়ে। সেই বৃদ্ধা সরকারী চাকুরী করিত। আমি তাহার মশালের আলোতে কিছু সূতা কাটিয়াছি। উহা আমার পক্ষে জায়েজ (বৈধ) হবে কি-না?”
ইমাম সাহেব প্রশ্নকারিণীর পরিচয় জানতে চাইলেন। উত্তরে স্ত্রীলোকটি বলিল, “আমি বিশরে হাফীর বোন।”
ইমাম সাহেব ইহা শুনিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং বলিলেন, “এরূপ ধর্মভীরুতা তাঁহারই বংশের জন্য উপযুক্ত বটে।” তৎপর বলিলেন, “আপনার পক্ষে উহা জায়েজ (বৈধ) নহে। অন্যথায় আপনাদের পরিষ্কার পানিতে ময়লা নজরে পড়িবে। আপনারা তাঁহার আদর্শ অনুসারে কাজ করুন। অর্থাৎ আপনার ভাই বিশরে হাফীর আদর্শ মানিয়া চলুন। তবেই আপনিও তাঁহার ন্যায় হইতে পারিবেন।”

No comments

Powered by Blogger.